তিস্তা পাড়ে আতঙ্ক পানির শো শো শব্দে

0
377

লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ   ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত ৪ দিন ধরে লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় বন্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ভাঙন। এতে গত এক সপ্তাহে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে দু’শতাধিক বাড়ি। প্রতি মুহূর্তে বসতবাড়ি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটর। যা নতুন বিপদ সীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপরে। আগের হিসেবে বিপদ সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে। ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

তিস্তা ব্যারাজ বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারি বর্ষণের সঙ্গে উজানের পাহাড়ি ঢলে গত ১ জুলাই সকাল থেকে তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওই দিন বিকেল ৩টায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৫৮ সেন্টিমিটার। পর দিন কিছুটা কমে গেলেও ৩ জুলাই সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি পেয়ে একই গতিতে বৃহস্পতিবার বিকেলে এ পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টের নতুন বিপদ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার। ব্যারাজ রক্ষার্থে প্রায় সব জলকপাট খুলে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ৫টি উপজেলার চরাঞ্চলের নিচু এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার সংকট দেখা দিলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। জেলার আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন সলেডি স্প্যার-২ বাঁধের ভাটিতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।

এদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকায় ৫ শতাধিক পরিবার গত ১০ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া ওই উপজেলার গড্ডিমারী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, সির্ন্দুনা, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিয়ার রহমান জানান, মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১০টি বসতবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাস্তুহারা মানুষগুলো তাদের ঘরবাড়ি বাঁধে ও উচু স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

চরাঞ্চলের করিম, তাইজুল ও রবিউল ইসলাম জানান, ঘরে হাঁটু পানি। মাচাংয়ের ওপর চুলা বসিয়ে কোনো রকমে চাল সিদ্ধ খেয়া দিনাতিপাত করছেন তারা। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণ দেওয়া হইনি বলে তাদের দাবি।

জানা গেছে, বন্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী ভাঙন। গত এক সপ্তাহে জেলায় ২ শতাধিক বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো। আদিতমারী উপজেলার কুটিরপাড় বালুর বাঁধের প্রায় দু’শ’ মিটার নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধটি রক্ষায় কাজ শুরু করেছে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ। তারা জরুরি প্রতিরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও বাঁশের পাইলিং দিয়ে বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাউবো দাবি করেছে এ বাঁধে ২ হাজার ৯৮৬টি জিও ব্যাগ নদীতে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাদের এ হিসাব মানতে নারাজ স্থানীয়রা। স্থানীয়দের দাবি ৩ দফায় আড়াই হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির চন্ডিমারী স্প্যার থেকে বারঘড়িয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানালেও কোনো কাজে আসেনি। ফলে এ বাঁধটি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের পানি উন্নয়ন বোডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল আলম চৌধুরী জানান, উজানের ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় বিপদ সীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে তিস্তায় পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। বর্ষাকালে পানি প্রবাহ এভাবে বাড়া-কমার মাঝেই চলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) শফিউল আরিফ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোতে কাজ চলমান রয়েছে। আতঙ্কের কিছু নেই। বাঁধ রক্ষায় জরুরিভাবে কোথাও প্রয়োজন পড়লে তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।