আজ সেই ৭ মার্চ

0
199

 

মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাবিব

লাখো বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণ আজও বাঙালির স্মৃতির ক্যানভাসে স্বরণীয় হয়ে আছে। ১৯ মিনিটে দেয়া ১১০৭ শব্দের অগ্নিঝরা সে ভাষণ শুনলে এখনো গা শিহরে উঠে।  বঙ্গবন্ধুর দেয়া দীর্ঘ ভাষণে তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের উপর যুগ যুগব্যাপী চলতে থাকা অত্যাচার-লাঞ্ছনা-বঞ্চনা আর উৎপীড়নের প্রতিবাদে পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে রুখে দাঁড়াবার প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলার অভ্যূদয়ের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় উজ্জ্বল একটি দিন ছিল ৭ মার্চ।

দৃশ্যপটঃ রবিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিট। পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে পুরো জাতি তখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষায়, সে সময় অগ্নিঝরা একাত্তরের এদিনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট পরে বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু দৃপ্ত পায়ে উঠে এলেন মঞ্চে। স্লোগান আর মহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানালেন অপেক্ষামাণ জনসমুদ্রকে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি অনন্য দিন। প্রজন্মের পর প্রজন্মে যারা এই ঐতিহাসিক ভাষণ শোনেন, তখনই তাদের মানসপটে  ভেসে ওঠে স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা আন্দোলন- সংগ্রামের মুহূর্তগুলো, আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের আদর্শে। নানা গবেষণার পর মাত্র ১৯ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

অন্তহীন প্রেরণাঃ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি হিসেবে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের এই ভাষণের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য কখনোই হারাবে না। আজীবন আপসহীন লড়াই সংগ্রামে আপসহীন নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের জাতীয় জীবনের অমূল্য সম্পদ ও অন্তহীন প্রেরণা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এ ভাষণের চেতনা ও আদর্শ আমাদের সকলের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

দুরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাষণঃ মানব সভ্যতার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। ভাষণটি ছিল খুবই সাজানো ও প্রাণবন্ত। আবার রাষ্ট্রনায়কসুলভ অভিব্যক্তি এতে প্রকাশ পেয়েছে। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ভাষণে কিভাবে লড়াই করতে হবে সে বিষয়ের নির্দেশ ছিল। বিশ্বে এ ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাষণ হিসেবে বিধৃত।

মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিমন্ত্রঃ একাত্তরের ৭ মার্চে বিশাল রেসকোর্স ময়দান রূপ নেয় জনসমুদ্রে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সব মিছিলই এসে থামে রেসকোর্স ময়দানে। ঢাকা শহর ছিল মিছিলের শহর। মিছিল আর মিছিল। জনতার ঢলে শুধু স্লোগান আর স্লোগান। বাঁশের লাঠির সঙ্গে লাখো কণ্ঠের স্লোগানে কেঁপে ওঠে সেদিনের জনসমুদ্র এবং ঢাকা শহর। বাতাসে উড়ে সবুজ জমিনে বাংলার মানচিত্র অাঁকা লাল সূর্যের অসংখ্য পতাকা । বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর মুজিব কোট পরে বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু দৃপ্ত পায়ে উঠে এলেন মঞ্চে।  স্লোগান আর মহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অপেক্ষামাণ জনসমুদ্রকে অভিনন্দন  জানিয়ে শুরু করলেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ। রেসকোর্স ময়দানের এই ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে ডাক দেন, সেই ডাকেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। পরে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নৃশংস গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এদিকে গোটা জাতি ছিল প্রস্তুত, ৭ মার্চের ভাষণের দিকনিদের্শনা জাতির সামনে স্পষ্ট, যা বঙ্গবন্ধু দিয়েছিল এভাবে, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ ৭ মার্চের ভাষণের অন্যতম অংশ ছিল, জীবনের বিনিময়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। ভাষণের যেসব অংশে বঙ্গবন্ধুর আদেশ, নির্দেশ, অনুরোধ ছিল সেগুলো মুক্তিযুদ্ধকালে অগ্নিমন্ত্রের মতো কাজ করেছে।

অপূর্ব উপস্থাপনাঃ বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের তেইশ বছরের রাজনৈতিক শোষণ- বঞ্চনার ইতিহাস এবং বাঙালির সুস্পষ্ট অবস্থানের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরেন। তুলে ধরেন দ্বন্দ্বের স্বরূপ। পাশাপাশি বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।

 

লেখকঃ সাংবাদিক।