লটকনের বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি

0
17
মিলাদ হোসেন অপু,ভৈরব:

নরসিংদী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল বেলাব উপজেলা। ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফল যেমন সারা বাংলাদেশে রপ্তানি হচ্ছে, তেমনি অল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় লটকন চাষে ঝুঁকে পড়ছে ব্যবসায়ীরা। অতিরিক্ত পুষ্টি গুন সমৃদ্ধ সকল বয়সী লোকদের নিকট প্রিয় ফল হিসেবে লটকনের চাহিদা দেশে-বিদেশে সমাধৃত। ফলে লটকন চাষ এখন এলাকার কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবকরা লটকন চাষে ঝুঁকছে। উপজেলার স্থানীয় বাজার গুলোতেও উঠতে শুরু করেছে লটকন। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে ভীড় জমাচ্ছে এসব বাজার গুলোতে। লটকন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ  বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেলাবরের লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও রপ্তানী হচ্ছে বলে জানা যায়।

সরেজমিনে বেলাব উপজেলার মরজাল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারিভাবে ঝুড়ি ভরে লটকন নিয়ে বসে আছে লটকন চাষীরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারীরা লটকন চাষীদের ঘিরে রেখেছে। ভাল লটকনগুলো প্রতিমণ ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটু নিম্নমানের লটকন ১৮শ থেকে ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তারপরও চাষীদের মুখে হাসি। এ সময় রাজার বাড়ির বাগান মালিক শহিদ মিয়া হাসি মাখা মুখে বলেন, আমার ৪০টি বাগান আছে। আমি প্রতি বছর লটকন বিক্রি করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অধিক লাভবান হই। গত বছরের তুলনায় এবার ফলন কম হলেও ভাল দামেই বিক্রি করছি এ লটকন। অপরদিকে ব্যবসায়ী তারা মিয়া জানান, আজকের বাজারে ২২শ থেকে ৩ হাজার টাকা মণ লটকন বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিনই এ বাজারে এসে লটকন বিক্রি করছি। খরচের তুলনায় অধিক লাভ হওয়ায় এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। গত বছর ১০টি বাগান চাষ করলেও এবার ১৫টি বাগান চাষ করছি।

ব্যবসায়ী হিরণ মিয়া জানান, আমি এই বাজার থেকে লটকন কিনে ঢাকায় সাপ্লাই করি। ঢাকা থেকে এ মাল দেশের বাহিরেও রপ্তানী করা হয়। আগের তুলনাই লটকনের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। ব্যবসায়ী কবির মিয়া জানান. আমার বাড়ি বাজিতপুরে সেখানেও লটকন চাষ হয় কিন্তু তেমন সুস্বাদু না হওয়ায় লটকনে লাভবান হতে পারছি না। বেলাবরের লটকন অনেক মিষ্টি ও সুস্বাদু হয় বলে এ লটকন বিক্রি করে লাভবান হওয়া যায়। কুমিল্লার রামচন্দ্রপুর থেকে আসা আবু হানিফ বলেন, লটকনের জন্য বিখ্যাত এ নরসিংদী’র বেলাব উপজেলা। এখানে অনেক ভালমানের লটকন পাওয়া যায়।
৩২শ থেকে ৪ হাজার টাকা মণ লটকন এখান থেকে নিয়ে কুমিল্লায় বিক্রি করি। প্রতি কেজি বেশি দাম হলেও অধিক সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতাদের অনেক চাহিদা রয়েছে , বাগান মালিক মেহেদী হাসান ভূইয়া জনি জানান, বেলাব উপজেলাতে সবচেয়ে বড় লটকন বাগান আমরা চাষ করি। এবার ৪০ বিঘা জমিতে আমি লটকন চাষ করেছি। এ বাগানে আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকা। কিন্তু এ লটকন বিক্রি করে মুনাফা পেয়েছি ১৮ লাখ টাকা। অধিক মুনাফা ও লটকনের চাহিদা থাকায় এ ব্যবসা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাগান মালিক হাজী আব্দুল আওয়াল ভূইয়া বলেন, বীজ তলা থেকে লটকন চারা তুলে পতিত জমিতে সাড়ি বদ্ধ ভাবে লাগানো হয়। ১ বছরের মধ্যেই এ সব লটকন চারায় মুকুল আসে। একেকটা লটকন গাছের গোড়া থেকে শাখা প্রশাখা পর্যন্ত অসংখ্য লটকনের ফলন হয়ে থাকে।  আমি ১০ বিঘা জমি লটকন চাষ করছি। আমার ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমি এই ১০ বিঘা জমির লটকন এক ব্যবসায়ীর কাছে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। এটি একটি লাভজনক ব্যবসা। তাই এ ব্যবসা করছি।
বেলাব উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা, নাজিম উর রউফ খান জানান, বেলাব উপজেলা লটকনের জন্য প্রসিদ্ধ উপজেলা। এখানে মাটি লাল ও পাহাড় আছে। এজন্য এর বৈচিত্র্য একটু বেশি। লটকন বেলাব উপজেলার একটি উচ্চ মূল্য ফসল। মাঘ মাসের শেষের দিকে লটকনের ফুল গাছে দেখা যায়। তবে এ ফল বাজারে আসে প্রায় জুন মাসের দিকে। প্রায় ৩ মাস এ ফল বাজারে পাওয়া যায়। বেলাব উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে এ লটকন চাষ হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় এবছরও ছাড়িয়ে গেছে। যে অঞ্চলে লাল মাটি আছে সে অঞ্চলেই লটকন চাষ ভাল হচ্ছে। মানুষ কলমের চারা ব্যবহার করে লটকন চাষ করছে। এক হেক্টর জমিতে ২৫০টির মতো লটকনের চারা লাগানো যায়। এক একটি গাছ থেকে ৫ থেকে ৭ মণ লটকন পাওয়া যায়। গত বছরের তুলনায় এবছরও প্রায় আড়াই হাজার টন লটকন চাষ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমাদের কৃষি অফিস হতে সহযোগিতা নিয়ে পুনঃবয়স্ক গাছের জন্য টিএসপি, জৈব সার ব্যবহার করা হচ্ছে। বেলাব উপজেলার আমলাব, উজিলাব, বটেশ্বর, বাজনাব, পাটুলি গ্রামে লটকনের বাম্পার ফলন হয়েছে। লটকন চাষে কোন রকম বাড়তি খরচ নেই। কীটনাশক, পানি, পরিচর্যা কোন কিছুরই প্রয়োজন হয় না লটকন চাষে। খরচ কম, ফলন বেশি হওয়ায় লটকন চাষীরা লাভবান হচ্ছে বেশি।