কবে রোধ হবে বাল্য বিবাহ?

0
628

দেশ ও সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান অনেক বেশি। উন্নত বিশ্বে পুরুষের পাশাপাশি দেশ গড়ায় নারীরাও সমান তালে অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেলেও এখনো অনেক নারীর জীবন বাল্যবিবাহের কারণে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী হয়ে যায়। এতে করে সংসার-জীবন বুঝে ওঠার আগে খুব কম বয়সে ‘মা’ হয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন মেয়েরা। অতীতের বাল্য বিবাহের সামাজিক কুপ্রথা আজও চলছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তা বন্ধ করা যায়নি। সকলের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে কেন যায়নি? কারা এ জন্য দায়ী? সরকার, সমাজ না ব্যক্তি মানুষ?

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও বাল্যবিবাহকে অন্যতম বাধা মনে করা হচ্ছে।

গ্রামগঞ্জের গরিব, নিম্নবিত্ত, অশিক্ষিত পরিবারে কন্যাসন্তানকে জন্ম থেকেই মনে করে বোঝা যত তাড়াতাড়ি ঘাড় থেকে নামানো যায়, ততই মঙ্গল, অন্তত একটা মুখের খোরাক তো বাঁচবে। বাল্যবিবাহের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানের মঙ্গল করতে চেয়ে অমঙ্গল করেন। অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিলে তার ক্ষতি করা হয় এই সত্য অনেক মা-বাবা উপলব্ধি করতে পারেন না। গ্রামাঞ্চলের যেসব পরিবার অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেয়, তাদের অশিক্ষা ও অজ্ঞতার সীমা নেই। তারা ভাবে না, হয়ত জানেও না যে, ১০-১২ বছর বয়সের মেয়েদের শরীর ও মন তৈরি হবার আগেই যদি বিয়ে দেয়া হয় তাহলে নারী পূর্ণ নারীত্বের বয়সে পৌঁছার আগে তার বিয়ে দিলে সন্তান ধারণ ও প্রসবের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে প্রসূতিমৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম বড় কারণ প্রসূতির বয়স কম। নাবালিকা মায়ের স্বাস্থ্য কম বয়সেই ভেঙে পড়বে এবং নানারকম স্ত্রী ব্যাধি ও যৌনরোগের শিকার হবে। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়েই অনেক কিশোরী মারা যায়। যারা মারা যায় না, তাদের স্বাস্থ্য খুব খারাপ হয়। মায়ের স্বাস্থ্য খারাপ হলে নবজাতকের স্বাস্থ্যও ভালো হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। এছাড়াও এতে ত্বরান্বিত হয় জাতীয় মানব সম্পদের অবক্ষয়।

আরও একটা বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, সন্তান প্রসবের সময় মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কিশোরী মায়েদের মধ্যে। অল্প বয়সী ও অপুষ্ট মায়ের গর্ভের সন্তান পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। জন্মের সময় তার ওজন ও উচ্চতা হয় স্বাভাবিকের চেয়ে কম। সে কারণে আমাদের দেশে খর্বাকৃতি ও কৃশকায় নবজাতকের সংখ্যা অনেক বেশি। কম ওজন আর কম উচ্চতা নিয়ে যে শিশুর জন্ম হয়, তার মা নিজেই ভগ্নস্বাস্থ্য হওয়ার কারণে শিশুটি জন্মের পরে বুকের দুধ পায় না; যারা পায়, তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে পায় না। এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্থ হয়। আমাদের দেশে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তাই তারা ঘন ঘন অসুখে ভোগে। শিশুমৃত্যুর হারও সবচেয়ে বেশি এই বয়সী শিশুদের মধ্যেই।

আমার গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে। বিভিন্ন বন্ধের সময় যখন বাসায় যাই তখন শুনি, যে মেয়েটা ৭ম বা ৮ম শ্রেনীতে পড়তো সেই মেয়েটির নাকি বিয়ে হয়েছে। তখনই আমার মানবিক বোধগুলো অসাড় হয়ে পড়ে, ভাবি যাদের বয়স লেখাপড়া, খেলাধুলা আর আনন্দ-ফুর্তি করার তখন তাদের জোর করে বিয়ে দিয়ে পরের ঘরে এক অচেনা পরিবেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ঐ বয়সে তাদের সংসারের ঘানি টানতে হয়, বাড়ির পরিজনদের খুশি রাখতে দাসি হয়ে দিন-রাত খাটতে হয়। আর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেহে রাতে যখন দু’চোখে ঘুম নেমে আসে, তখন স্বামী ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তার কাম চরিতার্থ করে। না বলার কোনই জো নেই, কারণ তারা যে অশিক্ষিত গরিব পরিবারের হতভাগ্য নাবালিকা সন্তান।

এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ একটা বিরাট অভিশাপ হিসেবে থেকেই যাচ্ছে। ২০১৪ সালের গার্লস সামিটের পর থেকেই, বাংলাদেশে বিবাহের নূন্যতম বয়স কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ বছর ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে সংসদে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’ পাশ হয়। এ আইন পাশের ফলে, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত, ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯’ বাতিল হয়ে যায়। ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯’ এ বলা হয়েছিল কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং কোনো পুরুষ ২১ বছরের আগে যদি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কিন্তু নতুন আইন পাশের পরপরই আইনটির ধারা-১৯ নিয়ে নানান বিতর্ক শুরু হয়। এই ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই মা-বাবার সম্মতিতে বিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু যে দেশে মা-বাবারা কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে থাকেন, তাঁদের সম্মতির কথা বলাই বাহুল্য। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের এই ধারাটির ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে; অনেকে এই ধারা বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন। এই দাবি যুক্তিসংগত। কারণ, বিশেষ ধারাটি থাকলে এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হবে না। যেসব মা-বাবা কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিতে চান, বিশেষ বিধান তাঁদের জন্য একটা সুবিধাজনক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তাই বিধানটি বাতিল করা অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান আইনেও ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯’ আইনের বয়সের সীমা একই রেখে, শাস্তির সময়কাল এবং অর্থদন্ডের পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই বছর এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি, নতুন আইনে শাস্তির আওতায় কারা আসবে, তার পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা বিয়ে পরিচালনা করেন এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক বর, কনে বা তাদের পরিবার না, সংশ্লিষ্ঠ সবাই আইনভঙ্গের শাস্তি পাবেন।

এদিকে আশার কথা হচ্ছে যদিও বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাল্যবিবাহ বন্ধ করার পক্ষে অনুকূল নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্প্রতি আমাদের দেশে কিছুটা হলেও বাল্যবিবাহ কমতে শুরু করেছে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে একটা সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। ঝালকাঠির রাজাপুরের কিশোরী শারমিন আক্তার নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকাতে গিয়ে বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এ জন্য সে স্বদেশে ও বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছে। বিশ্বের ১৩ জন সাহসী নারীর একজন হিসেবে তাকে পুরস্কৃতও করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশালের এক মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সোনিয়া আক্তারও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছে।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, এই যে বাল্যবিবাহ এটা শুধু আমানুষিকতাই নয়, এটা হিংস্রতা, সতীদাহ প্রথার ভিন্নরূপ। তাহলে এর প্রতিষেধক কী? সমাধানই বা কী? আমার মনে হয়, গ্রামে-গঞ্জে মেয়েদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো, যাতে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সচেতনতা বাড়ে আর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। পাশাপাশি এর প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে এবং ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’ এর সফল বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করলেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব। কিন্তু এসব কাজের সফল বাস্তবায়ন কি হবে কোনদিন? হয়তোবা হবে। সেই দিনটির অপেক্ষায় রইলাম।

লেখকঃ আরিফুল ইসলাম আরিফ:

শিক্ষার্থী চতুর্থ বর্ষ, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।