ভৈরবে ৪ মাসে ১৯ জনের আত্মহত্যা

0
54

 

মিলাদ হোসেন অপু, ভৈরব:
ভৈরবে হঠাৎ করে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে ৫ জন আর গত ৪ মাসে ১৯ জন আত্মহত্যা করেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ নারী রয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণীসহ প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষও রয়েছেন। সমাজে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে সুশীল সমাজের লোকজনকে। একই সাথে দিশেহারা ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও অভিভাবকেরা।
জানাগেছে, শহরের নাটাল মোড় এলাকায় গত শনিবার সকালে সোহেল মিয়া নামে এক পাদুকা ব্যবসায়ী ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের বাড়ি উপজেলার মধ্যেরচর গ্রামে। সোহেলের এমন মৃত্যুকে কেউ মেনে নিতে পারছে না। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবী সোহেল পাদুকা ব্যবসায় লোকসানের কারণে তিনি ঋণগ্রস্ত ছিলেন। পাওনাদারদের চাপে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। যদিও এ কথা মানতে নারাজ স্থানীয়রা। এর একদিন আগে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শহরের কমলপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার ঝুমু নামে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত ঝুমুর বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার পীরপুর গ্রামে। গত ৬ মাস আগে পরিবারের অমতে একই এলাকার এক যুবকের সাথে বিয়ে হয় তার। পরে তারা কমলপুরে ভাড়া বাসায় ওঠে। ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে স্বামী বাসা থেকে বেরিয়ে গেলে দরজা আটকে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করে বলে জানায় পাশের ভাড়াটিয়ারা।
এ ঘটনার ২ দিন আগে অর্থাৎ ২২ জুলাই পৌর এলাকার পঞ্চবটিতে মোহাম্মদ আলী নামে এক যুবক আত্মহত্যা করে। এর ১ দিন আগে ২১ জুলাই উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের নবীপুর থেকে ওয়াসী নামে ৮ম শ্রেণি পড়–য়া ১৬ বছর বয়সী এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কেন এই যুবতী আত্মহত্যা করেছে? অদৃশ্য শক্তির ভয়ে মুখ খুলছে না কেউ। তাছাড়া ২ জুলাই শহরের জগন্নাথপুর এলাকায় দুলাল মিয়া নামে এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে।
সমাজে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে সুশীল সমাজের লোকজনকে। ফলে একদিকে যেমন দিশেহারা ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও অভিভাবকেরা। তেমনি অন্যদিকে এসব ঘটনাকে পূঁজি করে সমাজের এক শ্রেণির অসাধু মানুষের বিরুদ্ধে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে নীরিহ লোকজনকে মামলা দিয়ে হয়রানীর অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া হাতেগুনা কয়েকটি আত্মহত্যার কারণ জানা গেলেও একাধিক ঘটনা আড়ালে রয়েছে। ফলে মানুষের মনে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। জেগেছে নানা প্রশ্ন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভৈরব রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ বলেন, এই যুগের মানুষ বা তরুণ-তরুণীদের মূল্যবোধ, আদর্শ এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব রয়েছে। একই সাথে অপূরনীয় স্বপ্ন দেখা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। তাছাড়া তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার অর্থাৎ অল্প বয়সে স্মার্ট ফোন ব্যবহারও অন্যতম কারণ। এছাড়া সমাজে নীতিহীন মানুষের ছড়াছড়ি রয়েছে। ফলে অবাস্তব স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ কিংবা নিরাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এই জগন্যতম কাজ থেকে ছেলে-মেয়েদেরকে ফেরাতে হলে বাবা-মাকে তাদের পেছনে সময় দিতে হবে। স্ব-স্ব ধর্মের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিতে হবে।
এ ব্যাপারে ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, পারিবারিক কলহ, দারিদ্রতা, হতাশা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে সমাজে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া প্রেম ঘটিত বিষয়কে কেন্দ্র করেও উঠতি বয়সে তরুণ-তরুণীরা আত্মহত্যা করছে। আসলে আত্মহত্যা বা নিজেকে নিজেই শেষ করে দেয়া, এটা কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত না। আত্মহত্যা মহাপাপ, প্রত্যেক ধর্মেই নিষেধ রয়েছে। অথচ যারা এসব করছে তারা না বুঝেই করছে। তাই সমাজে আত্মহত্যা বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদেরকে বুঝাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সমাজে আত্মহত্যার খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। যাতে করে আত্মহত্যার বা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসে। ফলে সহজে কোনো নীরিহ মানুষ অযথা হয়রানীর শিকার না হয়। কিন্তু সমাজের এক শ্রেণির লোকজন লাশ উদ্ধারের পর থানায় তদবীর শুরু করেন। তারা ময়না তদন্ত বিহীন লাশ নিয়ে যেতে চান। যা সঠিক না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার বা নিহতের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও ময়না তদন্ত শেষে পিএম (পোসমর্টেম) রিপোর্ট হাতে পেলে নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ বেরিয়ে আসে। একই সাথে দীর্ঘ সময় হাতে নিয়ে তদন্ত করলে আত্মহত্যার বা মৃত্যুর আসল কারণ বের করতে পারে পুলিশ।