**রহস্যময় মৃত্যূ**

0
93
১৪ আগস্ট বৃষ্টি রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গিয়েছে। তাই আজ ওর ফেসবুক আইডি একটিভ দেখে স্বভাবতই বেশ উৎকন্ঠিত হয়ে উঠলাম। অনেক্ষণ সবুজ বাতি জলতে দেখে একটা হাই লিখে ম্যাসেজ করেই দিলাম। অবাক করা ব্যাপার, ২ মিনিটের মাথায় ম্যাসেজটা সিন করলো!’ যদিও কোনো উত্তর আসেনি!’
মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিতে লাগলো, অঙ্কের সমীকরন না মিললে যেমন নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হয় আজও তেমনই নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে! ম্যাসেজ সিন করা দেখেও তাই আমি আর কিছু না বলে চুপচাপ ডাটা অফ করে বাসার সামনে হাঁটতে বের হয়ে গেলাম।
মনের ভেতর প্রচন্ড ভয় আর কৌতুহল দু’টাই কাজ করছে এখন।
তবে কি বৃষ্টি ফিরে এসেছে আবার?’ যদি এসেও থাকে তবে কি আদৌ মানুষ হয়ে এসেছে? নাকি অন্যকিছু? কারন কিছুদিন আগেইতো আমি নিজ হাতে ওকে….
নাহ্ আর ভাবতে পারছিনা, বেশি ভাবলে একসময় নিজেই হয়তো পাগল হয়ে যাবো।
পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় সিজান এর সাথে দেখা। হাসি হাসি মুখ করে সে বললো’ কিরে দোস্ত ভালো আছিসতো?’ চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিই আমি। আজকাল সব কিছু কেমন যেনো অসহ্য লাগে! কারো কথার উত্তর দিতেও যেনো কার্পন্যবোধ হয়!’ আমি কি তবে দিনদিন অলস হয়ে যাচ্ছি?’
কিরে কই হারাইলি?’ সিজান এর কথায় বাস্তবে ফিরে আসি আমি। হাসি হাসি মুখ করে বুঝাইলাম যে, কিছু হয়নি আমার।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর তাওহীদা আসে।
সাইন্স এর ছাত্রী কিন্তু প্রেম করে মানবিক শাখার ছেলে সেই সিজানের সাথে। দুই ভিন্ন মেরুর দুইটা মানুষ একসাথে একই মেরুতে কিভাবে পড়লো তা আসলেই একটা রহস্যের ব্যাপার। যাই হোক ক্লাস শেষে প্রাইভেটে সিজান আমার কাছে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে- ”দোস্ত কোনো আইডিতে রিমেম্বারিং কিভাবে মারতে হয় জানিস? মনে কর, ওই আইডির মালিক মারা গিয়েছে কিন্তু অন্য আরেকজন সেটা ইউজ করে, এখন সে ওই আইডিতে রিমেম্বারিং মারতে চাই, সেটা কিভাবে পসিবল?”
প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অবাক হলাম আমি। মাথা নাড়িয়ে জানালাম- জানিনা। সিজান চলে যাওয়ার পথে পেছন থেকে আমি ওর হাতটা টেনে ধরে জিজ্ঞেস করলাম- কেনো জানা দরকার তোর এটা? সিজান প্রায় তড়িঘড়ি করেই উত্তর দিলো, বৃষ্টির আইডিটা রিমুভ মারতাম। গতকাল ওর আডিতে ঢুকেছিলাম আমি এটা করার জন্য, কিন্তু শেষ অব্দি পারিনি! তাছাড়া আরো একটা বিরাট সমস্যা করে ফেলেছি ওর আইডি থেকে অনেকের পাঠানো ম্যাসেজ সিন করে!
কেও যেনো খুব বিশাল সাইজের একটা ডিনামাইট বোমা ব্রাষ্ট করলো আমার সামনে; এমন একটা অনূভুতি অনূভব করলাম আমি।
আমার আর বৃষ্টির মধ্যে খুব ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো। সবাই জানতো ব্যাপারটা। কিন্তু যে বিষয় টা সবচেয়ে বেশি অবাক করে আমাকে তা হলো- সিজানের কাছে বৃষ্টির আইডি পাসওয়ার্ড কিভাবে গেলো!
তবে কি সিজানের সাথে বৃষ্টির কিছু চলছিলো? কিন্তু বৃষ্টিতো কখনো কিছু বলেনি এ ব্যাপারে। নাহ্ আর কিছু ভাবতে পারছিনা। একজন মৃত মানুষের প্রতি ক্রমেই রাগটা যেনো হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে! সাথে সিজানের প্রতিও! যদিও ও জানতোনা বৃষ্টি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড কিন্তু তাওহীদার সাথে….
মাথায় আমার আগুন গরম রাগ উঠে গেলো। নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে উঠে পড়লাম সিট থেকে। পুরো স্কুল ঘুরেঘুরে খুঁজলাম সিজানকে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। কেও বলতেও পারলোনা। ফিরে আসার সময় একটি মেয়ে বললো সিজান আর একটি আপুকে স্কুলের পিছনের দিকের বাগানে যেতে দেখেছিলাম।
আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে চলে গেলাম সেখানে। আজ সিজানের সাথে একটা বোঝাপাড়া করতেই হবে। বাগানে পৌঁছাতেই শুনতে পেলাম সিজানের চিৎকার! বেশ রাগ নিয়ে সে তাওহীদাকে বলছে- তুই এটা কিভাবে করতে পারলি?
মনে মনে ভাবলাম সিজান নামের ছেলেরা হয়তো এমনই হয়! একজনকে মেরেছে, আজ আর একজনের সাথে ঝগড়া! একে ছেড়ে দেওয়া অন্যায়। ছুটে গিয়ে ওর গলা চেপে ধরে চিৎকার করে রাগেরস্বরে বললাম,তুই কিভাবে পারলি এটা? বন্ধু হয়ে তুই কিভাবে এটা করলি?’ তোর কি একবারো মনে হয়নি বৃষ্টি আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলো! আমাদের সবার খুব কাছের বন্ধু ছিলো সে! একবারও কি ভাবার ইচ্ছে হয়নি! আমি বা আমরা কতোটা ভালোবাসতাম বৃষ্টিকে! তোকে আজ আমি এখানেই কবর দিয়ে দিবো!
হঠাৎ আক্রমনে বেশ হতচকিত হয়ে গেলো সিজান! প্রতিরক্ষা করার কোনো চেষ্টাও সে করলোনা। আমার শক্ত হাতের ঘুষিটা একেবারে ওর নাক বরাবর গিয়ে পড়লো। সাথে সাথেই যেনো রক্তের ফোয়ারা ছুটে এলো ওর নাক থেকে!’ আরেকটা ঘুসি মারার জন্য হাত উঠাতেই তাওহীদা আটকে দিলো আমায়। কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করলো- তাসফিয়ারে, সব দোষ আমার। তুই ওকে ভুল বুঝিসনা আর। বৃষ্টির মৃত্যুর জন্য আমি দায়ি, হ্যাঁ আমিই দায়ি বৃষ্টির মৃত্যুর জন্য!
শেষ কথাটা শোনার পর আমার চারদিক যেনো ক্রমান্বয়ে বিশাল শূন্যতায় নিমজ্জিত হতে থাকলো। হাত পা অবশ হয়য়ে এলো! মাথার শিরা উপশিরার প্রতিটা রক্ত কনিকা যেনো তাদের চলাচল বন্ধ করে দিলো।
তাওহীদা ফোঁপাতে ফোঁপাতে আবার শুরু করলো- তোর মতো আমিও ভেবেছিলাম যে, সিজানের কাছে যেহেতু বৃষ্টির আইডি পাসওয়ার্ড  আছে সেহেতু ওদের মাঝে নিশ্চয় কিছু চলছে। কিন্তু বিষয়টা মেনে নেওয়া আমার কাছে বিষ খাওয়া সমতুল্য ছিলো। আমি যে সিজানকে চাই, কতোটা চাই তা হয়তো বলে বোঝাতে পারবোনা তোকে। এতটা চাওয়া অন্য কোনো মেয়ে চাইতেই পারবেনা তা আমি হলপ করে বলতে পারি। তাই আমি ঠিক করেছিলাম যেভাবেই হোক বৃষ্টিকে সিজানের পথ থেকে সরাতেই হবে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার কোনো ইচ্ছাই ছিলোনা বৃষ্টিকে একদম মেরে দেওয়ার!শুধু লক্ষ্য ছিলো হাত পা ভেঙে পঙ্গু করে দেবো। যেনো আপনা আপনিই সে সরে দাঁড়ায় সিজানের পথ থেকে। তাছাড়া আর কি বা করতাম বল? ভালোবাসার চাওয়া যে প্রচন্ড ভয়ানক! এতটাই ভয়ানক যে, আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো!
একটু আগে সিজান যখন আমাকে বললো ভালো বন্ধু হিসেবে বিশ্বাস করে বৃষ্টি সিজানকে তার আইডির পাসওয়ার্ড দিয়েছিলো কিছু সিকিউরিটি চেক করানোর জন্য, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি আমি। কাঁদতে কাঁদতে সব বলে দিয়েছি ওকে! এখন তোর হাতেই আমার জীবন। ইচ্ছা করলে আমাকে তুই পুলিশে দিতে পারিস। আমার কোনো আফসোস থাকবেনা। কারন কোনো মানুষের জীবন নেওয়ার জন্য বিবেক যে সাজা দেয় তার চেয়ে বড় সাজা এ পৃথিবীতে বোধহয় আর নেই!
টপটপ করে পিচঢালা পথের উপর পড়ছে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা! ছাতা বিহীন এক পথিক আমি।কিছু যেনো খোঁজার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আকাশ পানে চেয়ে! মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার পানে। অনেকে হয়তো পাগল ছাগলের ডিজিটার রূপ বলেও আখ্যায়িত করছে। সেই ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাচ্ছি আমি। আমার মনোযোগ শুধু আকাশের পানে। কিন্তু আজ কেনো জানিনা সমিকরনের উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছিনা কিছুতেই। কদিন আগেও বৃষ্টির মুখের হাঁসিটা খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হতোনা আকাশ পানে চেয়ে। তবে আজ কেনো সমস্যা হচ্ছে? কেনো খুঁজে পাচ্ছিনা আজ? তবে কি সন্দেহ করেছি বলে বৃষ্টি রাগ করেছে আমার উপর?
গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, কারো সাথে কোন রকম মিল থাকলে কর্তৃপক্ষ দয়ী নয়।
লেখকঃ নাদিরা মিতু
নাসিরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ময়মনসিংহ