এক বছরেও ফলাফল দিতে পারেনি জাবির ইংরেজি বিভাগ ,শিক্ষকের গাফিলতি

0
64

আরিফুল ইসলাম আরিফ, জাবিঃ পরীক্ষা হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ৪১ তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের ফলাফল  দিতে পারেনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইংরেজি বিভাগ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ৬০ জনের অধিক শিক্ষার্থী কর্মজীবনে অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি হতাশায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ।

অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ইংরেজি বিভাগের ৪১ তম আবর্তনের ‘ভাষা শাখার’ পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২৬ জুলাই ২০১৭ সালে এবং তা শেষ হয়েছিল ২৭ আগস্ট ২০১৭ (মৌখিক পরীক্ষাসহ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী যেকোন বিভাগের পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়ার ৭৫ দিনের মধ্যে ফলাফল দিয়ে দেয়া হয় বলে জানা গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলাফল দিতে পারেনি ইংরেজি বিভাগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আহমেদ রেজার  কারণে তাদের ফল আটকে রয়েছে। প্রথমে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান। তিনি দ্রুত দিতে সকল শিক্ষককে খাতা জমা দিতে তাড়া দিতেন। কিন্তু খাতা দেখে জমা দিতে দেরি করতে থাকেন অধ্যাপক রেজা ও কয়েকজন শিক্ষক। এরপর তিনি বারবার তাগাদা দিয়েও অধ্যাপক রেজাকে খাতা ও নম্বর জমা দেয়াতে পারেননি।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এরপর অধ্যাপক রেজার একগুয়েমির কারণে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি থেকে সরে দাঁড়ান তিনি এবং অধ্যাপক রেজা আগ্রহের সাথে সেই দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনি এখনো ফলাফল দিতে পারেননি।

এদিকে খাতা যে দ্বিতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠিয়েছেন অধ্যাপক আহমেদ রেজা সেই শিক্ষকের নাম তানিয়া তাসনিম বলে জানা গেছে। তিনি নিয়মিত ক্লাস নেননা বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। অধ্যাপক রেজার ব্যাপারেও ক্লাস কম নেওয়া ও টিউটোরিয়াল পরীক্ষার ফল না দেওয়া বা কখনো অনেক দেরিতে দেয়ার অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

তবে রেজাসহ ইংরেজি বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষকই বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন কোর্সের নিয়মিত ক্লাস নেন ও সঠিক সময়ে ফলাফল দিয়ে দেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে এক বছরেও ফলাফল না হওয়ায় ছাত্রছাত্রীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে জীবনের ব্যাপারে নিরাশ বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্রী বলেন, এক বছর আগে বাড়িতে জানিয়েছি যে স্নাতকোত্তর শেষ হয়েছে, কিন্তু সেই ফল এখনো আমরা পেলাম না। বাড়ি থেকে বাবা-মা ফোন দিয়ে জানতে চায়। আমরা যতই বলি এখনো ফল দেয়নি তারা বিশ্বাস করেন না।

তবে এই প্রতিবেদক তাদের যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন সবাই তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

নাম প্রকাশ না করতে চাওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলেন, শিক্ষকদের কাছে যতক্ষণ নম্বর দেয়ার ক্ষমতা থাকে তারা তাদের ‘ক্ষতি’করতে পারেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী জানান , দুঃখের বিষয় পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে তাদের সহপাঠী শহীদুল ইসলামের মা এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। আর আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত শিক্ষকমণ্ডলী আমাদের পরীক্ষা পেছালেন না। যদিও আমরা অনেক অনুরোধ করেছিলাম শিক্ষক মণ্ডলীর কাছে। তারা আমাদের কে বোঝালেন, যে চলে গেছে তাকে আর ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব না, সামনে তোমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যত ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধ্যাপক আহমেদ রেজা Approaches & Methods in L2 teaching ৫০১ নং কোর্সটি নিতেন যেটির খাতা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। সেটি রয়েছে এখন তানিয়া তাসনিম এর কাছে।

এ বিষয়ে পরীক্ষা কমিটির প্রথম চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনিরুজ্জামান বলেন, আমি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছিলাম, কারণ অনেকেই ঠিক সময়ে খাতা ও নম্বর দিচ্ছিলেন না। সে কারণে আমি পরীক্ষা কমিটি থেকে সরে গিয়েছি। আর কিছু বা কারো নাম বলতে পারবোনা।

এ বিষয়ে সে সময়ের ইংরেজি বিভাগের সভাপতি তানিয়া শারমিন ববি বলেন, আমি একাধিকবার আহমেদ রেজা স্যারকে ফলাফল দিয়ে দেয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছি কিন্তু তিনি দেননি। সর্বশেষ মে মাসের মিটিংয়েও তিনি ৭ দিনের মধ্যে দেবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু শুনলাম এখনো দেননি।

তিনি বলেন, আমি উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককেও বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। আসলে উনি আমার শিক্ষক, উনাকে আমি যতটুকু পেরেছি ফলাফল দেয়ার তাগাদা দিয়েছি। কারণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমার খারাপ লাগছিল। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক ব্যাপার।

তিনি আরও জানান, গত এক বছরে কিন্তু সান্ধ্যকালীন কোর্সের তিনটি পরীক্ষার ফলাফল ঠিকই দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে অধ্যাপক আহমেদ রেজাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আসলে দুইটি ভিন্ন কোর্সের খাতা তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে যাওয়ায় ফলাফল দিতে দেরি হচ্ছে। আমি মাস দুয়েক হলো দায়িত্ব নিয়েছি। আশা করি আগামী সপ্তাহে ফল দিয়ে দিতে পারবো।

খাতা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি তিনি অস্বীকার করে বলেন, না খাতা আসলে হারাইনি। আমার আলমারি ও টেবিলের খাতার মধ্যে মিশ্রণ ঘটেছিল।

আগের সভাপতি কেন তার কাছে দায়িত্ব দিলো এ ব্যাপারেও তিনি মুখ খোলেননি।

এক বছর ফল ধরে ফল না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের জীবনের ক্ষতির ব্যাপারেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তবে ফল দ্রুত দিয়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন অভিযুক্ত অধ্যাপক আহমেদ রেজা।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। উল্লেখ্য, এর আগে এই বিভাগ ৪৩ তম আবর্তনের ফল প্রকাশেও এক বছর সময় নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল। আরিফুল ইসলাম আরিফ