নকলায় নিধন করা হচ্ছে বাবুই পাখি

0
18

 

 

 

শেরপুর প্রতিনিধিঃ শেরপুরের নকলায় অবাধে নিধন করা হচ্ছে অরণ্যের পাখি। নির্বিচারে নিধন করায় বিলুপ্ত হচ্ছে তাঁতী পাখি বাবুই। ফলে বিপন্নের পথে নিপুন কারিগর বাবুই পাখিসহ পরিবেশ বান্ধব অনেক পাখি ।

চন্দ্রকোনা কলেজের একটু আগে হালিম ডাক্তারের বাড়ির পাশে বন্দটেকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে অবাধে বাবুই পাখি ধরা হচ্ছে। রোববার বিকালে ওই এলাকায় গিয়ে দেখাযায়, স্থানীয় হায়দর কবিরাজ কয়েক জনকে সাথে নিয়ে কারেন্ট জাল দিয়ে বিশেষ কৌশলে বাবুই পাখি ধরছেন। তিনি বন্দটেকী এলাকার সাইফুল ইসলাম কবিরাজের ভাই।

বাবুই পাখিগুলো বাঁচার তাগিদে খাদ্যের সন্ধানে এসে, নিজেই লোভী মানুষের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে।
চন্দ্রকোনা রাজলক্ষী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামাল হোসেনসহ প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক জানান, কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী “স্বাধীনতার সুখ” কবিতাটি অধিকাংশ মানুষের মুখে মুখে শুনা যায়। এই অমর কবিতাটি এখন ৩য় শ্রেণির বাংলা বইয়ে পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত। শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের কবিতা পড়েই বর্তমানের শিক্ষার্থীরা বাবুই শিল্পের অলৌকিক নিপুন কারিগরের বিষয়ে জানতে পারছে। শিখতে পারছে নিজের হাতে কাজ করার গুরুত্ব কতটুকু।

মানুষের মনে চিন্তার খোরাক জাগ্রত করতো এবং স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করত এই বাবুই পাখির নিজের হাতে তৈরী বাসা। কিন্তু এখন আর বাবুই পাখি ও তার নিজের তৈরী দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শৈলী সরু চিকন পাতা দিয়ে প্রস্তুত বাসা তেমন আর চোখে পড়েনা।

চন্দ্রকোনা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি বেলাল আহমেদ শিপু ও সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল
হক আজিম, আওয়ামী লীগ নেতা মোকসেদ ও বাছুর আলগার সফিকুল ইসলাম সুখন জানান, বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে
অট্টালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে। পাকা হোক তবু ভাই পরের বাসা, নিজ হাতে
গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা–; এক সময়ের নজরকাড়া বাবুই পাখিকে নিয়ে কবির এ কবিতাটি
মানুষ আজো উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করলেও, তা আর বাস্তবে নজরে পড়েনা। কালের বিবর্তনে
হারিয়ে যেতে বসেছে অরণ্যের পাখি, আর মহা বিপন্নের পথে হাটছে বাবুই পাখি ও তাঁতির
কৌশলে তার নিজের তৈরী বাসা। বাবুই পাখির উপস্থিতি এমনটাই প্রমান করে। বাল্যবিবাহ,
মাদক, জুয়ার মত বিভিন্ন অপরাধ যেমন সমাজ ধ্বংস করে, ঠিক তেমনি পাখি নিধন পরিবেশের
ভারসাম্য নষ্টকরে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে সমাজ এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সামাজিক
অপরাধ ধমনের পাশাপাশি পাখি নিধন ও অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তারা বলেন, বাবুই পাখির বাসা আজ অনেকটা স্মৃতির অন্তরালে বিলীন হতে চলেছে। অথচ আজ থেকে ১৫/১৬ বছর আগে কোন এক সময় ছিল, যখন প্রতিটি এলাকায় তাল-খেজুর গাছে তাঁতি পাখির কিচির মিচির শব্দ শুনা যেত। দেশের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জের মাঠে ঘাটের তাল গাছে দেখা যেত বাবুই পাখির নিপুণ কারু খচিত তৈরি বাসা।

চন্দ্রকোনা ইউপি চেয়ারম্যান সাজু সাঈদ সিদ্দিকী জানান, তিনি এলাকাবসীদের নিয়ে এবিষয় সতেনতা মূলক ও মতবিনিময় সভা করেছন। এর ফল শ্রুতিতে ক্রমেই বাবুই পাখি নিধন বন্ধ হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাঁর এলাকায় বাবুই পাখিসহ অন্যকোন অরণ্যের পাখি নিধন করা হবে না বলে তিনি আশ্বস্থ করেন।

পাখি প্রেমিরা বলেন, পুরাতন গাছ নিধন, বিশেষ করে তালগাছের মত গাছগুলো কর্তন ও
ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে অরণ্যের পাখি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। তাছাড়া পাখি
হারিয়ে যাওয়ার পিছনে জলবায়ু পরিবর্তন অধিক ক্ষতিকর ভুমিকা রাখছে। এতে করে বাবুই পাখি
আজ মহা বিপন্নের পথে হাটছে বলে মনে করছেন তারা। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি
ভেঙ্গে যাচ্ছে ইকোসিস্টেম। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাহিত্য শিল্পও।
এবিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস জানান, কৃষকরা নগদ লাভের
আশায় ক্ষেতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করেন। এতে উপকারী পোকামাকড়ের
পাশাপাশি মারাযাচ্ছে বাবুই পাখির মত কীটভোগী পরিবেশ বান্ধব অরণ্যের অনেক প্রজাতির
পাখি। পরিবেশ বান্ধব পাখি কমে যাওয়ায়, বাড়ছে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়। তাই অতিরিক্ত
কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পাখির বসবাস উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে গাছ লাগানোর
পাশাপাশি যেকোন পাখি নিধন বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুর রহমান জানান, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় পাখি
নিধন বন্ধ করে, তাদের বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তুলা উচিত।
তাছাড়া পাখির উপকারী দিক তুলেধরার মাধ্যমে গনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অরণ্যের পাখি
নিধনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা হবে। তিনি জানান, সম্প্রতি উপজেলার গড়েরগাঁও এলাকা
থেকে ডজন খানেক বক অবমুক্ত করা হয়েছে। লোকজনকে নিয়ে করা হয়েছে সচেতনা মূলক সভা। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে তিনি জানান।