তাদের অপরাধ ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে মিলাদ পড়ানো

0
419

মিলাদ হোসেন অপু, ভৈরবঃ   তোদের এত বড় সাহস শেখ মজিবের নামে তোরা মিলাদের আয়োজন করেছিস, এখন জেলে যেতে হবে। পুলিশের সদস্যরা একথা বলেই সবাইকে লাঠিপেটা শুরু করল। ১৯৭৬ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী ভৈরবে পালন করতে গিয়ে ২২ জন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা কর্মীকে  পুলিশ গ্রেফতার করে।

পরে থানায় তাদেরকে অমানষিক  নির্যাতন করে জেলে পাঠানো হয়। সেদিন আয়োজনকারীদের অপরাধ ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে মিলাদ পড়ানো। তারপর দীর্ঘদিন কারাভোগ করার পর পর্যায়ক্রমে তাদেরকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সেই সাহসীদের কথা ভৈরবে এখন আর কেউ স্মরণ করেনা। আজও তারা অবহেলিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে।

তাদের মধ্য অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দুঃখে  কষ্টে মারা গেছে। বঙ্গবন্ধুর ৪৩ তম  মৃত্যু বার্ষিকী আজ। প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী হিসেবে ৪২ বছর পর  সেদিনটি আজ ফিরে এসেছে। সেদিনের গ্রেফতারকৃত রসরাজ সাহা ও ফিরোজ মিয়া এই প্রতিনিধিকে জানান ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর ১৯৭৬ সালে সামরিক সরকারের ভয়ে তখন এদেশের গাছের পাতাও বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারন করতনা।

কিন্ত আমরা ২২ জন সেদিন সাহসীকতার সাথে প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করতে মিলাদের আয়োজন করেছিলাম। এখন আওয়ামী লীগের নেতারাসহ কেউ আমাদের কথা মনে করেনা। প্রতিবছর বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ দিবসে নেতারা আমাদেরকে নিমন্ত্রণ পর্যন্ত দেয়না।

জানা গেছে আজ থেকে ৪২ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের প্রথম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন করতে ভৈরবে মিলাদের আয়োজন করা হয়। আয়োজককারীর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম আক্কাছ ও ছাত্রলীগ নেতা আসাদুজ্জামান ফারুক। তৎকালীন হাজি আসমত কলেজের শহীদ আশুরন্জন ছাত্রাবাসে ( বর্তমানে শৈবাল হোটেল)  শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল, কোরআন খতম ও দোয়ার আয়োজন করা হয় সেদিন।

দুপুরের পর বিকেল সাড়ে ৩ টায় ১২ জন মৌলভী ছাত্রাবাসে এসে কোরআন খতম শুরু করেন। বিকেল ৪ টার মধ্য একে একে ২২ জন নেতা কর্মী মিলাদ মাহফিলে উপস্হিত হয়। নিমন্ত্রনের সময় ভৈরবের অনেকেই মিলাদে আসার কথা ছিল কিন্ত সামরিক সরকারের পুলিশের ভয়ে সেদিন অনেকেই উপস্থিত হয়নি। সেদিন যারা উপস্হিত হয়েছিল তারা হলো মুক্তিযোদ্ধা ও যুবলীগ নেতা  ফখরুল আলম আক্কাছ ( বর্তমানে ভৈরব পৌর মেয়র) , আসাদুজ্জামান ফারুক ( বর্তমানে সাংবাদিক) , রুহুল আমিন, মাহাবুব ( বর্তমানে মৃত) , মতিউর রহমান, মফিজুর রহমান, মোশারফ হোসেন জজমিয়া ( বর্তমানে মৃত) , জিল্লুর রহমান জিল্লু ( বর্তমানে মৃত) , আসাদ মিয়া ( বর্তমানে মৃত) , আতাউর রহমান, আসাদুল হক শিশু, দীলিপ চন্দ্র সাহা ও তার ভাই দিপেন্দ্র চন্দ্র সাহা, ফজলুর রহমান ( বর্তমানে মৃত) , আবদুল হামিদ, ইদ্রিছ মিয়া, মাহবুব আলম, রসরাজ সাহা, সুবল চন্দ্র কর ( বর্তমানে মৃত) , শাহজালাল হোসেন, আজমল ভূইয়া ও ফিরোজ মিয়া।

মিলাদ শুরুর আগেই এখবর পৌঁছে যায় সামরিক সরকারে উচ্চ মহল ঢাকায়। তাৎক্ষনিক ওয়ারলেস ম্যাসেজ পেয়ে ভৈরব থানার প্রায় ৪০/৫০ জন পুলিশ ছাত্রাবাসটি ঘিরে ফেলে। সেদিন পুলিশ ছাত্রাবাসে প্রবেশ করেই মৌলানাদের কোরআন খতম বন্ধ করে দিয়ে গালিগালাজ শুরু করে। লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে সবাইকে। এসময় ফখরুল আলম আক্কাছ পুলিশের উপস্হিতির কারন জানতে চাইলে তাকে বেধরক পেটানো হয়। তখন পুলিশ বলল তোমরা সবাই এরেস্ট, কেউ পালাবার চেষ্টা করবেনা। তারপর মৌলভিদেরসহ সবাইকে ভৈরব থানায় নেয়া হলো। থানায় নিয়ে সারারাত ২২ জনকে অমানষিক নির্যাতন করা হলো।

পরদিন ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কিশোরগন্জ মহকুমা আদালতে চালান দেয়া হলো। মৌলভীদেরকে থানায় নেয়ার পর মুচলেকা রেখে ( মুচলেকায় বলা হলো ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর কোন মিলাদ আয়োজনে তারা যাবেনা)  ছেড়ে দেয়া হলো। আদালত তাদেরকে জামিন না দিয়ে সেদিন ২২ জনকেই কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।