একাত্তর টিভি বয়কট করার আহ্বান ও আলেমদের প্রতিক্রিয়া

0
54

মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাবিবঃ পরিকল্পিতভাবে ইসলাম ও দেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম আখ্যায়িত করে বহুল বিতর্কিত বেসরকারি টিভি চ্যানেল একাত্তর টিভিকে বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম।

দীর্ঘদিন ধরে একাত্তর টিভির প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে দেশের আলেম উলামা ও সর্বসাধারণ এই ঘোষণা দেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একাত্তর টিভি বয়কটের অংশ হিসেবে একাত্তর টিভির ফেসবুক পেইজ আনলাইক ও ইউটিউব চ্যানেল আনসাব্সক্রাইব করার দাবি জানিয়েছে অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারী। একাত্তর টিভি বয়কটের ডাক আসার পর ইতোমধ্যে লক্ষাধিক ফলোয়ার ও সাব্সক্রাইবার কমে গেছে।

লালবাগ মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি সাখাওয়াত হুসাইন রাজি বলেন, “আমি ৭১টিভিকে আমলিভাবে বয়কট করেছি। চার বছর হয়ে গেছে তাদের কোনো আহবানে সাড়া দেইনা। যেদিন তারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে মিথ্যাচার করেছে এবং ভুল তথ্য দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে সেদিন থেকেই আমার এই সিদ্ধান্ত।”

জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, “যাদের সর্বত্রই ইসলাম বিদ্বেষ তাদের বয়কট করা সময়ের দাবি।”

তাকওয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান মাওলানা গাজী ইয়াকুব বলেন, “টিভি সেটের সামনে শেষ কবে বসেছি মনে নেই, আর এককুত্তার টিভিতো প্রশ্নই আসেনা। আসুন ইসলাম ও দেশবিরোধী মিডিয়া গুলোকে বয়কট করি।”

“জন্ম থেকেই জ্বলছি ও জ্বালাচ্ছি” -৭১ টিভি” শিরোনামে মাওলানা আঃ হাই মোঃ সাইফুল্লাহ তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে বলেন, একাত্তর টিভি মহান স্বাধীনতার “৭১” কে হাতিয়ার বানিয়ে, বাংলাদেশের ইতিহাসে লজ্জাজনক ‘বিদ্বেষী’ প্রচার মাধ্যম ও পদ্ধতির প্রবর্তক। আমাদের দেশের কোনো টিভি চ্যানেলই তাদের স্বার্থের বাহিরে গিয়ে ইসলাম ও ধর্মানুরাগীদের পক্ষে খুব বেশী কথা বলেনা, কিন্ত ইসলামের বিরুদ্ধে বলতে অন্তত হিসেব কষে। এক্ষেত্রে শুরুর দিন থেকেই সকল রাখঢাক, শিষ্টাচার ও নীতিনৈতিকতা উপেক্ষা করে “ইসলাম বিদ্বেষী” হিসেবে একাত্তর টিভির আবির্ভাব! তারা কাউকে তোয়াক্কা করেনা- তাদের ঠেকায় কে- তাদের সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার ধরন দেখলেই যে কেউ বিষয়টি অনুভব করতে পারবেন। একই সাথে তিনি বলেন, “আমজনতার একাত্তর টিভি বয়কট, আনফলো পেজ, জনমততৈরী, আনসাবস্ক্রাইব চ্যানেল অব্যাহত রাখতে হবে। যদিও তারা এতে গা করেনা। কিন্তু আমাদের অন্তরের ঘৃনার দাম আল্লাহর কাছে আছে।”

বিভিন্ন সময় করা ৭১ টিভির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তুলে ধরে মাওলানা সাইমুম সাদী একাত্তর টিভির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের একটি তালিকা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, “একাত্তর টিভি থেকে করোনায় মৃত্যু বরণকারী ব্যাক্তিকে জানাজা ও কবর না দিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আলেম ওলামা ও মাদ্রাসায় প্রায়ই জঙ্গি কানেকশন আছে বলে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রচার করতে চায়। একাত্তর টিভির উপস্থাপক করোনাকালীন আলেম উলামার সম্মিলিত দোয়া অনুষ্ঠান নিয়ে কাটাক্ষ করে।পাঠ্যপুস্তকে ইসলামী চেতনা বিরোধী অধ্যায়ের বিরুদ্ধে হেফাজতের বক্তব্য সরকার মেনে নেয়ায় হেফাজত ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রেসনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে স্রেফ প্রতিহিংসার কারণে নানা আপত্তিজনক মন্তব্য করে। বাংলাদেশে একমাত্র টিভি চ্যানেল যেটা ধর্ষণের কারণ হিসেবে ওয়াজ মাহফিলকে অভিযুক্ত করেছে।”

প্রখ্যাত আলেমে শায়খ মাওলানা আহমাদুল্লাহ তাঁর স্ট্যাটাসে বলেন, “কোনো কোনো মুর্খ বক্তা ওয়াজ মাহফিলে নারীকে নিয়ে বেফাঁস ও মুর্খতাসূলভ উক্তি করে এটা অসত্য নয়, তাই বলে সে সব বক্তব্যের কারণে ধর্ষকরা নারী ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হয়- একটি টিভি চ্যানেল এতো নির্জলা মিথ্যাচার ও কুৎসিত মন্তব্য করতে একটুও বাধলো না! গণমাধ্যম মানে কি শুধু ময়লা-আবর্জনা ঘাঁটার যন্ত্র? তিনি প্রশ্ন তোলেন, “৭১টিভির মতো চ্যানেলগুলো যেভাবে নারীকে সারাক্ষণ পণ্য ও ভোগ্য বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে তা থেকে ধর্ষক উৎপাদন হওয়ার কথা, নাকি ফেরেশতা?”

জনপ্রিয় লেখক অারিফ আজাদ বলেন, “৭১ টিভি যে একটা আঁতেল টিভি চ্যানেল, এইটা যারা বুঝেন না তাদের দুইটা ঘটনা স্মরণ করাই। মাস-কয়েক আগে কুয়েটের ছাত্ররা তাদের শিক্ষাবর্ষের শেষ দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখতে পাগড়ি আর জুব্বা গায়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে ফটোসেশান করলে সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়। সেবার ৭১ টিভির এক মহিলা সাংবাদিক, গায়ে শার্ট আর জিন্স পরে ওই ছেলেগুলোকে প্রশ্ন করেছিলো যে— ‘আপনারা বাঙালি পোশাক ছেড়ে আরবের পোশাক পরিধান করত গেলেন কেনো?।মহিলা নিজে গায়ে দিয়েছে শার্ট আর জিন্স। তা যে পশ্চিমা সংস্কৃতি হতে আমদানিকৃত, এবং বাঙালি সংস্কৃতির সাথে তার যে বিন্দুবিসর্গও সংযোগ নেই— তা একেবারেই সুনিশ্চিত। নিজের গায়ে পশ্চিমা আবরণ জড়িয়ে, মহিলা অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন কেনো তারা বাঙালি পোশাক না পরে আরবের পোশাক পরেছেন! মানে হলো— আপনি পৃথিবীর যে-কোন দেশ, যে-কোন সংস্কৃতির পোশাক গায়ে তুলেন তাতে ৭১ টিভির কোন সমস্যা নেই, কিন্তু আপনি কোনোভাবেই আরবের পোশাক গায়ে তুলতে পারবেন না। তাহলেই বাঙালির ইজ্জত চলে যায়!”

তিনি আরো বলেন, “করোনা ভাইরাসের সময়ে ৭১ টিভি একটা টকশো তে করোনাক্রান্ত মানুষগুলোর মৃতদেহ দাফন না করে পুঁড়িয়ে ফেলবার দাবি তুলেছিলো। এতে নাকি ভাইরাস ছড়াবার আশঙ্কা কমে যায়। যেখানে WHO থেকে শুরু করে তাবৎ চিকিৎসাবিদ্যার সবাই একমত যে— মারা যাওয়ার ২-৩ ঘণ্টা পর মৃতদেহ থেকে আর ভাইরাস ছড়ায় না, সেখানে ৭১ টিভি আস্ত লাশকেই পুঁড়িয়ে ফেলবার মতলবে ব্যস্ত! এখানেও তাদের সুক্ষ্ম ইসলাম-বিদ্বেষ লুকায়িত। ৭১ টিভি তো বটেই, কোন টিভি চ্যানেল কিংবা পত্রিকার ফেইসবুক পেইজ আর ইউটিউব চ্যানেলে আমি কোনোভাবে সংযুক্ত নেই। ৭১ টিভির এহেন কর্মকান্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ওটা জনমতকে আমিও সমর্থন করছি। ধর্ম-অন্তপ্রাণ মানুষ মাত্রেরই উচিত বিরুদ্ধবাদীদের এড়িয়ে চলা। সেটা তাদের পত্রিকা না কিনে হতে পারে, পেইজ আন-লাইক করে হতে পারে, হতে পারে তাদের ইউটিউব চ্যানেল আন-সাবস্ক্রাইব করে।”

ছাত্র নেতা সাবেক ভিপি নুর একাত্ত টিভি বয়কটের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “৭১ টিভি তাদের প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য বার বার ফোন দিয়েছিলো। আমি সরাসরিই বলে দিয়েছি, বিভিন্ন সময়ে ৭১ টিভির পক্ষপাতমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। তাই ৭১ টিভিতে কথা বলার ইচ্ছে ও রুচি নেই। সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থকদের বলবো সকল ধরণের হলুদ সাংবাদিকতা এবং দালাল গণমাধ্যম বর্জন করুন।”