ধর্ষণের জন্য ধর্ষকই দায়ী

0
27
মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাবিব 
স্বাধীন দেশের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে হিংস্র শকুনের দল। না, শকুন নয়। ওরা রক্তে মাংসে গড়া মানবররূপি নরপিশাচ। এই নরপিশাচদের হিংস্র থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না  অবুঝ শিশু থেকে নিয়ে সকল বয়সী নারী। সম্প্রতি ভয়াবহ মাত্রায় নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনায় সারাদেশ বিষ্ময়ে হতবাক; ঘৃণা ও ক্ষোভে ফুঁসছে সারাদেশের মানুষ। আলোচনা চলছে সর্বত্র। সাধারণ মানুষ খুঁজে ফিরছে এর সম্ভাব্য কারণ।  ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করছে অনেকে। কেউ আবার ধর্ষণের পিছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে হরেকরকম বিতর্ক তৈরি করছে। কারো মতে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাকই দায়ী। কেউ বলে পোশাক নয়, পুরুষের মানুসিকতাই দায়ী। এ নিয়ে আমাদের সমাজে বিতর্কের শেষ নেই। উভয় পক্ষ তাদের মতকে সঠিক প্রমাণ করতে সুক্ষভাবে যুক্তি দিয়ে থাকেন। আসলে ধর্ষণের জন্য কে দায়ী সে বিষয়ে কথা বলার পূর্বে একজন ঈমানদারের গল্প বলি।
রাস্তায় স্বল্প কাপড় পরিহিতা মেয়েটির দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর এক ভদ্রলোক বললেন ‘নাউজুবিল্লাহ নাউজুবিল্লাহ! দেখছেন ভাই দেশের অবস্থা, কেমন অশ্লীল পোশাক পরছে। লজ্জা-শরম কিচ্ছু নাই।  সব দোষ এই সমস্ত মেয়েদের। এদের অশালীন পোশাকের জন্যই দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে। লোকটাকে বললাম, মেয়েদের জন্য পর্দা করতে হয় এই ওয়াজ তো ঠিকই মনে আছে কিন্তু আল্লাহ যে কুরআনে পুরুষদের চোখের পর্দা করতে বলছেন, দৃষ্টি হেফাজত করতে বলছেন সেই ওয়াজ ভুলে গেছেন কেন? তাছাড়া কেউ বোরকা কিংবা হিজাব না পরলেই কি তাকে ধর্ষণ করতে হবে?
আল্লাহ তায়ালা সূরা নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে প্রথমে  পুরুষদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজতের  নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর ৩১ নম্বর আয়াতে মহিলাদেরকে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং নিজের সৌন্দর্য ঢেকে রাখার  নির্দেশ করেছেন। সুতরাং দৃষ্টি হেফাজত  না করা পুরুষ আর বেপর্দা নারী উভয়ে সমান অপরাধী। তাহলে কোন যুক্তিকে সম্পূর্ণ দোষ নারীদের উপর চাপিয়ে নিজেকে মহা ঈমানদার দাবী করছেন!
নারীদের ইজ্জত আব্রু ঢেকে রাখা যতটা জরুরি  পুরুষদের জন্য দৃষ্টির হেফাজত করা ততটাই জরুরি। মহানবী (সাঃ) অসংখ্য হাদীসে চোখের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে বলেছেন। যেসব জিনিস দেখা নাজায়েয সেগুলো থেকে দৃষ্টিকে হেফাজত করতে হবে। বেগানা নারী, পর-পুরুষ, অশ্লীল ছবি ও পর্নোগ্রাফীসহ  সকল অবৈধ জিনিস দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সূরা বনী ইসরাঈলের ৩২ নং আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটি অশ্লীল কাজ ও অসৎ পন্থা।’ অর্থাৎ ব্যাভিচারের দিকে আকৃষ্ট করে এমন সকল কাজ থেকেও দূরে থাকতে হবে। অবৈধ দৃষ্টিপাত মানুষের ভেতর অবৈধ কাজের প্ররোচণা দেয়, মনে কুচিন্তা আর বিকৃত ইচ্ছা তৈরি করতর পারে, যা ধর্ষণের মানসিকতাকে উসকে দেয়। অতএব সর্বোপরি নিজের দৃষ্টিকে হেফাজত করতে হবে।
ইসলামে শুধু অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের চূড়ান্ত রূপটাই যিনা নয়। বরং যেসব কাজ যিনার প্ররোচনা দেয় সেগুলোও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং তাও যিনা বলে গণ্য। বস্তুত কু-নজর হচ্ছে অনৈতিক কাজের ‘ভূমিকা’। এজন্য হাদীসে একে ব্যভিচার গণ্য করা হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হল দেখা। কানের ব্যভিচার শোনা। জিহ্বার ব্যভিচার বলা। হাতের ব্যভিচার ধরা। পায়ের ব্যভিচার হাঁটা। মন কামনা করে আর লজ্জাস্থান  তা সত্য বা মিথ্যায় পরিণত করে। -সহীহ মুসলিম ২৬৫৭
অর্থাৎ চোখ-কান-হাত-পা-জিহ্বা সবই যিনা করে- যিনার প্ররোচনা দেয়, যা পূর্ণতা পায় লজ্জাস্থানের মাধ্যমে। সুতরাং এসব অঙ্গের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া যেহেতু নরাধম ধর্ষকের উম্মাদনা এবং পশুত্ব জাগ্রত করতে ভূমিকা রেখেছে অনলাইন বা অফলাইনে প্রদর্শিত নারীদেহের খোলামেলা কিংবা যৌন আবেদনময় দৃশ্য। যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণের উপসর্গসমূহ বন্ধ করতে হবে। অশ্লীল ওয়েব সিরিজ, ভারতীয় নিম্নরুচীর অশ্লীল চলচ্চিত্র, পর্নোগ্রাফি, সিনেমা, নাটক, টেলিফিল্ম ও ইন্টারনেটে সকল প্রকার নগ্নতা, যৌনতা-অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা চলছে। অনেকেরই অভিমত, এই সব নগ্ন ও ধর্ষণের দৃশ্য দেখে শিখে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টার কারণেই সমাজে ধর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুব সমাজের নৈতিক অধঃপতন রোধ এবং কিশোর, তরুণ ও যুব সমাজের চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহভীরুতা, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধের সঠিক চর্চা করতে হবে। শিক্ষার সকল স্তরে মুসলমানদের জন্য ইসলামী শিক্ষা এবং নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেয়েদের জন্য সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ইসলামি শরিয়া মোতাবেক পর্দা ও শালীন পোশাক পরিধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেননা নারীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা পর-পুরুষের সাথে কোমলভাবে কথা বলো না। অন্যথায় যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে লালায়িত হয়ে পড়বে। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলো। তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং আগের জাহেলিয়াতের মত নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়িও না।  (সূরা আহযাব ৩২-৩৩)
একই সাথে মহান অাল্লাহর আযাবের ভয় করতে হবে। যিনা বা ব্যভিচারের কঠিন শাস্তির কথা পবিত্র কোরআন ও হাদীস সমূহে উল্লেখিত আছে। যিনার সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে কঠিন বিধান রয়েছে। যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে হজরত মুহম্মদ (সাঃ) এর হাদিস বর্ণিত আছে যে, ‘আমি একদিন স্বপ্নে একটি চুলা দেখতে পেলাম যার ওপরের দিক ছিল সরু এবং ভেতরের দিক ছিল প্রশস্ত, যেখানে আগুন উত্তপ্ত হচ্ছিল এবং তার ভেতরে নারী পুরুষেরা চিৎকার করছিল। আগুনের শিখার উঠানামার সঙ্গে সঙ্গে তারাও উঠানামা করছিল, এ অবস্থা দেখে আমি জিবরাইল আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাইল আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উত্তর দিল, এরা হলো অবৈধ যিনাকারী নারী ও পুরুষ।’ (সহীহ আল-বুখারী)
ইসলামে যিনাকারীদের জন্য যেমন পৃথিবীতে রয়েছে কঠিন শাস্তি তেমনি পরকালে রয়েছে অনন্তকালের জাহান্নামের আগুন। পৃথিবীতে একজন যিনাকারীর শাস্তি হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত পুরুষ ও নারী যারা, তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর, তাদের এই বিষয়ের করুণা যেন তোমাদেরকে দুর্বল না করে, এমন বিষয়ে যা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং মহাপ্রলয় দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখো এবং বিশ্বাসীদের একদলকে তাদের শাস্তির সাক্ষী করে রাখো।’ (সূরা- আন-নুর: আয়াত- ২)
যদি বিবাহিত পুরুষ বিবাহিত নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করে তাহলে তাদেরকে একশত বেত্রাঘাত এবং পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে হবে। (সহীহ মুসলিম ১৬৯০)
ধর্ষণ একটি ভয়াবহ ব্যাধি। এ কেবল যৌন নির্যাতনই নয়; বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের বহিঃপ্রকাশ। দেশ ও জাতির জন্য কলঙ্ক। অনৈতিকতা ও পাশবিকতার চূড়ান্ত পর্যায়। এ থেকে আমাদের রক্ষা পেতেই হবে। তবে তা যেন শুধু মুখ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং কর্ম ও আচরণেও প্রকাশ পায়। যেসব জিনিস ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, একে উসকে দেয় এবং যে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও অবস্থানের সমন্বয়ে মানুষ এর প্রতি প্রলুব্ধ হয়, সেগুলো থেকে প্রত্যেককে নিজ নিজ শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী বেঁচে থাকতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা বন্ধের জন্য দায়িত্বশীলদের কাছে দাবি জানাতে হবে। সুস্থ ও সুষ্ঠু সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। সর্বোপরি ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে; আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহির কথা অন্তরে সদা জাগরুক রাখতে হবে।  আমাদের উচিৎ এসকল পাপকর্ম থেকে দূরে থাকা। এসকল যিনা বা ব্যভিচার দূর করতে পারলে একটি সুন্দর ও কলুষতামুক্ত সমাজ তথা একটি সুন্দর রাষ্ট্র গড়া সম্ভব হবে।
লেখকঃ বার্তা সম্পাদক, দৈনিক প্রভাতের ডাক।