সেলফি তোলাটা এক ধরনের মনোরোগ

0
459

নিজেকে প্রকাশ করার দুরদান্ত আকাঙ্ক্ষা আজকাল মানুষকে কখনো কখনো চূড়ান্ত বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রকাশের একটি মাধ্যম হইল ‘সেলফি’, অর্থাত্ স্মার্টফোন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কোনো এক রোমাঞ্চকর মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করা। তারপর তা ফেসবুক বা ইনস্ট্রাগ্রামে পোস্ট করা। পোস্ট করে কিছুক্ষণ পর পর নোটিফিকেশন দেখা—কতগুলি লাইক আসলো, কমেন্ট আসলো।

সেইসব মজার মজার কমেন্ট পরে খুশি হয়ে আরো অভিনব আরো নূতন কোনো সেলফির নেশায় মেতে ওঠা। আর দারুণ একটি সেলফি তুলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়াটাও এখন নূতন বিপদের আরেক নাম হয়ে উঠেছে। এই কারণে সেলফি তুলতে যেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে সারা বিশ্বেই। তবে এই উপমহাদেশে সেলফি-মৃত্যুর সংখ্যা সবচাইতে বেশি।

ভারত পাকিস্তানের পর সমপ্রতি বাংলাদেশেও যেন সেলফি ম্যানিয়ায় হিতাহিতজ্ঞান ভুলে মৃত্যুমুখে পড়ার ঘটনা বাড়ছে। কিছুদিন আগে কুষ্টিয়ার কয়েকজন বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈশ্বরদী ডাল গবেষণা কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা চলনবিলে নৌকাভ্রমণে বের হয়। নৌকাভ্রমণের সময় আকর্ষণীয় বা অ্যাডভেঞ্চার-দৃশ্য হিসাবে রোমাঞ্চকর সেলফি তুলতে গিয়ে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সূর্য ডোবার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নৌকার ছইয়ের উপর দাঁড়িয়ে বেশিরভাগ যাত্রী মোবাইল ফোনে সেলফি তুলবার চেষ্টা করলে ছই ভেঙে নৌকাটি সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। তাত্ক্ষণিক ১৭ জনকে উদ্ধার করতে পারলেও ছইয়ের নিচে বসে থাকা পাঁচজনকে তত্ক্ষণাত্ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে তিনজনের লাশ পাওয়া গিয়েছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, সামান্য ফ্রন্ট ক্যামেরায় ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে কেন এত আসক্ত হয়ে পড়ছে মানুষ?

গবেষকরা বলছেন, মানুষ নিজের ক্যামেরায় তোলা ছবির চাইতে আয়নায় প্রতিফলিত রূপকেই বেশি পছন্দ করে। আমরা আয়নায় যেই ছবি দেখি, ফ্রন্ট ক্যামেরাও হুবহু সেই ছবিই তুলে ধরে। সেই কারণেই ফ্রন্ট ক্যামেরার প্রতি বেশি আসক্ত মানুষ। তার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া আসবার পর যোগ হয়েছে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি সবার অন্তর্জালের সঙ্গে ভাগ করবার মানসিকতা।

তরুণ সমাজের একাংশ সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধু-বান্ধবদের মন্তব্য এবং প্রশংসা পেতে যেকোনো বিপদকেও তুচ্ছজ্ঞান করে। তারা মনে করে, যত বেশি বিপজ্জনক ছবি হবে ততই মানুষ প্রশংসায় করবে। আর এইসব কারণেই ‘সেলফি’ ক্রমশ মৃত্যুছবি তথা ‘কিলফি’ হয়ে যাচ্ছে।

কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদ মনে করেন, বিপজ্জনক সেলফি তোলাটা এক ধরনের মনোরোগ। এই নেশাকে অনেকে তাদের বন্ধু বা পরিচিতদের নিকট বিখ্যাত হবার শর্টকার্ট পথ বলে মনে করে থাকে।

এই জন্য সবার আগে ভালোবাসতে হবে নিজেকে। নিজেকে ভালোবাসাটা স্বার্থপরতা নয়, বরং সবাইকে ভালোবাসবার একটি পথ। নিজেকে ভালোবাসলে সেলফি কখনো কিলফি হয়ে উঠতে পারবে না।