চন্দ্রিকা

0
113

ডিক্যালের কোচিং এর সুবাদে ২০০৪ সালে সিলেট  যাই। সেখান শাপলা বাগ আবাসিক এলাকার ২ নং  রোডের একটা মেসে থাকা শুরু করি। মেসের নাম সামস লজ।মেসে থাকতে প্রথম দিকে খুব কষ্ট হয়েছে। মেসের  সবাই  ছিলো সিনিয়র। নিজেকে খুব অসহায়  লাগতো। সব সময় বাসার  কথা মনে পড়তো। কিছুতেই পড়াতে মন বসতো না। লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করতাম। কোচিং সেন্টারে  নিয়মিত  হাজিরা দিতাম।লেকচার গুলোতে মনযোগ দিতাম তবে মাঝে মাঝেই খেইল  হারাতাম। মনে হতো  বাসায়  মা কি করছ? আরোও সাতপাঁচ কত কি? মাকে ছেড়ে  কখনো  কোথায় একদিনের জন্য থাকিনি। এভাবেই চলছিল  মেস লাইফ। হঠ্যাৎই মেসের এক দিদির মামাতো বোন  বেড়াতে আসলো। তার নাম পপি।

পপি ভার্সিটির  কোচিংএ ভর্তি হবে। চম্পা দিদি পপির জন্য অন্যত্র  মেস দেখবেন। পপি অন্যত্র মেস পেলেই  চলে যাবে। প্রথম দিন ও খুব ক্লান্ত ছিলো বলে তেমন আলাপ  হয়নি। পরের দিন দুজনের মধ্যে আলাপ পরিচয় হলো। প্রথম আলাপেই ওর প্রতি কেমন যেন মায়া লেগে গেল। পপি দেখতে খুব মিষ্টি ও শান্ত শিষ্ট। ওর চোখ দুটো সবচেয়ে আর্কষণীয়। মায়াবী হরিণী চোখ। কথাও বলে আহ্লাদি স্বরে। কথার মাঝে জাদু আছে। সেই জাদুতে আমি কাবু। পপি চলে যাবে। আমার খুব মন খারাপ। মেসের সবাই ঠিক করলো পপি আমাদের মেসেই থাকবে। পপি আমাদের মেসে থেকে ভার্সিটির কোচিং করবে। আমাদের দুজনের মাঝে ভাব হয়ে গেল। পপিকে পেয়ে আমি ও পড়ায় মন দিলাম। ধীরে ধীরে মেস লাইফে  অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। খুব আনন্দে কাটছিল দিনগুলি। আমরা দুজন দুজনকে সব ব্যাপারে সাহায্য করতাম।সবাই মনে করতো আমরা মানিক জোড়। আমি আমার শ্রীমঙ্গলের  বান্ধবীদের  ভুলেই গিয়েছিলাম।

পপি ওদের জায়গা দখল করে নিয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। চান্স পাইনি বলে  বাসায় ফিরে আসি। পপির সাথে বিচ্ছেদ ঘটলো। ভার্সিটির জন্য একদম প্রস্তুতি নিতে পারিনি। সব সময়ই  পপির কথা মনে পড়তো। বই নিয়ে বসলেই কান্না আসতো। পপিকে খুব মিস করতাম। ওকে শুধু দেখতে ইচ্ছে করতো। তখন আমার মোবাইল ফোন ছিল না।তাই পত্র দ্বারা যোগাযোগ করতাম। আমি সব সময়ই  পত্র লিখতাম ওর কাছে। মাঝে মাঝে পোষ্ট করতাম।মাঝে মাঝে  করতাম না।নিজের   কাছেই  রেখে  দিতাম ।পপিও  আমার  পত্রের  উওর দিতো।এভাবেই  আমাদের  যোগাযোগ হতো।পপি শাবিপ্রবি তে চান্স  পায়। তখন ভার্সিটিতে  ঝামেলা  চলছিল ।তাই ওদের  ক্লাস শুরু হতে  দেরি হয়। আমি  মেডিক্যাল কলেজে চান্স না পেয়ে  এমসি কলেজে ভর্তি হই।আমার  ক্লাস শুরু হয়ে যায়।

আমি  আবার মেসে থাকা শুরু করি। ওইদিকে পপি  বাড়ি চলে যায়। তখন পপির বাবার অসুখ ধরা পড়ে ।চিকিৎসা করাতে ভারত ও গিয়েছিলেন। কিছু দিন  চিকিৎসা করিয়ে দেশে চলে আসেন। পপির বাবা একটু  সুস্থ তখন আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বিভিন্ন  টেস্ট করার পর ধরা পরে বাবার কিডনী  নষ্ট  হয়ে গেছে। আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে বাবাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠানো হয়। সেই দুর্দিনে আমি আর পপি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতাম। আমি আমাদের বাসার সামনের দোকান থেকে সাত/ দশ টাকা  মিনিটে কথা বলতাম। পপির সাথে কথা বলে কি এক প্রশান্তি লাগতো। মনের  ভেতরের কষ্টটা হালকা  হতো। আজ আমাদের  দুজনেরই বাবা নেই।

পপির  বাবা যেদিন পরলোক গমন করেন সেদিন পপি মেসে। ওদের ক্লাস শুরু হবে বলে বাড়ি থেকে চলে এসেছে। ভার্সিটির হলে উঠবে বলে ব্যাগ জিনিস পত্র গুঁছিয়েছে। পপির মনে শান্তি নেই । সারাক্ষণ শুধু তার বাবার জন্য চিন্তায় ব্যাকুল। বাড়ি থেকে এসেই বলে বাড়ি ফিরে যাবে। আমি ওকে বলি চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আগে হলের  সীট নাও তারপর বাড়ি যেও। পপিকে কিছুতেই সামলাতে পারিনি। পপি আমাকে বলেছিল তুমি আমাকে একটু বাড়ি দিয়ে আসবে বা গাড়িতে তুলে দিয়ে আসবে ? আমি তখন বলেছিলাম ঠিক আছে যাব। আমি একটু  স্যারের বাসা থেকে ঘুরে আসি।

সেদিন প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি  হচ্ছিল। আমি তবুও স্যারের বাসায় যাই। মেসে এসে দেখি পপি নেই। পপি চলে গেছে। তখন ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। রাতে খবর আসে পপির বাবা এ পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। পপি বাবা মারা যাবার  তিন বছরের মাথায় আমিও  বাবাকে  হারালাম। ২০০৮ সালের  জুলাই  মাসের ৯ তারিখ বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান। এর দুদিন আগে আমি মেসে যাই। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে আমি  টিউশন করতাম। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমরা তখন  অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। আমার  দিদি ও ভাই  আমাদের পরিবারের হাল ধরে। আমি টিউশন করে যা পেতাম তাই দিয়ে মাস চলে যেত। মাঝে মাঝে কষ্ট হলেও কষ্টকে পাত্তা দেইনি। মনে মনে  চিন্তা করেছি  পড়া শেষ করে ভালো জব করবো বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্  দেখতাম। স্বপ্নপূরণের পথে হাঁটার লক্ষ্য ঠিক করি। বেশি টাকা উপার্জন করে  বাবার আরোও ভালো চিকিৎসা করাবো। পরিবারকে  সাহায্য করবো। বাবা জীবিত থাকতে বাবার জন্য কিছুই করতে পারি নাই। সেই সময়ে ও পপি  আর  আমার মাঝে রেগুলার যোগাযোগ হতো।

জীবনের  আলো ছায়া খেলার মাঝে দুজন দুজনকে  মনোবল  জোগাতাম। নানা চড়াই উৎরাই পাড় করেছি দুজনে। আমি সুখ দুঃখ সব কিছু পপির সাথে শেয়ার করতাম। অর্নাস শেষ হতে না হতেই আমি চাকুরীতে প্রবেশ করি।পপির সাথে আমার আবার বিচ্ছেদ ঘটলো। দেখা হতো না তবুও যোগাযোগ ছাড়িনি। আমি প্রায়ই মোবাইলে  কল দিতাম। মাঝে মাঝে ও রিসিভ করতো না। মাঝের কিছু সময় পপি আমার সাথে তেমন যোগাযোগ করতো না। কি হয়েছিল? আমি জানি না। জিজ্ঞেস করলেও বলেনি কখনো।ভার্সিটিতে পড়ার অবস্থায় মিলি নামে একটি মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল। আমি ভাবতাম মিলিই ওর সবকিছু। মনে মনে মিলিকে ঈর্ষা হতো। যাইহোক আমিও ধীরে ধীরে মোবাইলে কথা বলা কমিয়ে ফেলি।চাকুরীর পাশাপাশি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিতে থাকি। পপি ও চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সময়টা ২০১৩ পপি  আর আমি  দুজনেই  ৩৪তম  বিসিএস পরীক্ষায়  প্রিলিমিনারিতে উর্ত্তীন হই।তখন থেকে আবার যোগাযোগ শুরু হলো। লিখিত পরীক্ষার আগে যোগাযোগ টা আরোও বাড়লো। আমি যা যা পড়তাম ওকে  তাই তাই পড়তে বলতাম। পপি গণিতে একটু দুর্বল ছিল। আমি ওদের  বাসায় গিয়ে গণিত দেখিয়ে দিতাম। সিলেটে গেলে মেসে না থেকে ওদের বাসায় থাকতাম। ওদের বাসা থেকে দু বিষয়ের লিখিত পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন। আমি লিখিত পরীক্ষাসহ ভাইভাতেও  উর্ত্তীন হই। নন ক্যাডার পদে  সিলেক্ট হই।

২০১৬ সালের ১০আগষ্ট নন ক্যাডার প্রধান শিক্ষক পদে ৯৯৮ জনের গেজেট প্রকাশিত হয়। ওই তালিকায়  আমার রেজি নম্বর ছিল। সেই সুবাদে আমি হয়ে গেলাম  নন ক্যাডার প্রধান শিক্ষক। কিন্তু পোস্টিং হয় অনেক  দেরি করে। আমি এখন নন ক্যাডার প্রধান শিক্ষক।যোগদান করি ২০১৭ সালের ৯ই  নভেম্বর। ২০১৬ সালে পরীক্ষার ডিউটি  দচ্ছি । পপি আমাকে কল করে বলে  আমার তো বিয়ে ঠিক হয়েছে। তুমি বিয়েতে এসো। ওর জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে চলেছে আর আমি আগে থেকে কিছুই জানলাম না। শুধু কল করে  নেমন্তন্ন। আমি এরকম আশাই করি নাই। কত জলপলা কল্পনা ছিল। পপির বিয়েতে যাব। ওর বিয়েতে যাইনি। পপি বিয়ের পিড়ঁতে বসলো। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে আমাকে ভুলেই গেলো। আমিও ওর  দেখানো পথ অনুসরণ করলাম। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ একদম  লবন্ধ হয়ে গেল।

বিয়ের পর ও সুখের  সংসার নিয়ে ব্যস্ত। পপির বরের নামটা পর্যন্ত আমি জানি না। একবার দুর্গাপুজোয় ওকে কল করে  বলেছিলাম বরকে নিয়ে বেড়াতে ল আসো। সে বলেছিল দেখি। বিয়ের পর ওকে আমি দেখিনি। বরকে দেখার ও সৌভাগ্য হয়নি। এমনকি ওদের বিয়ের ছবি  পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য হয়নি। whatsapp  এ বলেছিলাম তোমাদের একটা ছবি দিও। পপি দেইনি। আমি ও আর কখনো দেখার ইচ্ছা পোষন করিনি। মনে মনে ভাবি এই কি আমার চেনা জানা  পপি? মানুষ  বুঝি  মনিই  হয়। আকাশের রং যেমন  পাল্টায় তেমনি মানুষের মন। পপি মা হয়েছে। কত আনন্দের সংবাদ! এই সংবাদ  জানলাম ৫ ই সেপ্টেম্বর। মেয়ের নাম রেখেছে চন্দ্রিকা। চন্দ্রিকা তুমি আসবে এ খবর ও  আমি জানতাম না। আর তোমার আসার খবর ও পেলাম তিন মাস পর। চন্দ্রিকা তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। তুমি কি তোমার মার মতো হয়েছো? নাকি বাবার মতো। চন্দ্রিকা তুমি জীবনে অনেক বড় হও। শুধু  তোমার মায়ের মতো হইও না। তোমার মা আমাকে কষ্ট দেয়। আগের মতো আর ভালোবাসে না। চন্দ্রিকা তোমার মাকে আমি খুব ভালোবাসি।

লেখা:: সীমা রানী সরকার
প্রধান শিক্ষক: ভোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীমঙ্গল।