নানা সমস্যায় জর্জরিত জাবি’র কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি,ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

0
400

আরিফুল ইসলাম আরিফ, জাবি : নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। আসন সংকট, ওয়াশরুম নষ্ট এবং ব্যবহার অনুপযোগী, পর্যাপ্ত বই সংকট, পর্যাপ্ত ফ্যান সংকট, মেয়েদের ওযু করার ভাল ব্যবস্থা না থাকাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে লাইব্রেরিটিতে। কিন্তু এতো সমস্যা থাকার পরও যেন দেখার কেউ নেই। আর এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বেশি বেশি লাইব্রেরি মুখী হচ্ছেন। এতে করে লাইব্রেরিটিতে আসন সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে লাইনে দাঁড়ান। সাড়ে সাতটায় একজন কর্মচারী দরজা খুলে দিলে সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু সবাই লাইব্রেরির ডেস্কে পড়াশোনার সুযোগ পান না। মাঝে মাঝে সিট পাওয়া নিয়ে ছাত্রদের মাঝে কথা কাটাকাটি, এমনকি হাতাহাতিও হয়। আইন বিভাগের ৪৪ তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আসন সংকট চরমে। তদুপরি প্রত্যেক আসনের ওপর ফ্যান নেই। ফলে ফ্যানযুক্ত আসন পেতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলে ধাক্কাধাক্কি-হুড়োহুড়ি। এতে প্রায়ই কেউ না কেউ আহত হয়। ৪০ তম আবর্তনের শিক্ষার্থী আসিফ বলেন, ‘গত বছর জুন থেকে কেন্দ্রীয় লাইব্ররীর নিচতলার ওয়াশরুম নষ্ট এবং ব্যবহার অনুপযোগী। এক বছরেও কি এটা ঠিক করার সময় পেলো না প্রশাসন? জেনারেটর ও সিসি টিভি দিয়ে কি হবে যদি ওয়াশরুম ঠিক না থাকে? ছেলেদের টয়লেট মাত্র ৫ টা। এছাড়া এগুলোর ভেন্টিলেশন সিস্টেম নেই। আসলেই ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লিতে। ইতিহাস বিভাগের ৪৫ তম আবর্তনের রাজু আহমেদ বলেন, ‘লাইব্রেরীতে পর্যাপ্ত বই নেই। নেই পর্যাপ্ত ফ্যান। আর ৩৪ বছর ধরেও এখনো লাইব্রেরীর অর্ধেকাংশ নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরীমা মোস্তাক বলেন, ‘লাইব্রেরীতে মেয়েদের ওযু করার জন্য ভাল ব্যবস্থা নেই।

এতে করে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। সবুজ শিকদার নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘লাইব্রেরীর বইগুলার দিকে তাকানো যায় না, কোন বই নির্দিষ্ট সেলফে নেই, বইয়ের লেভেল নেই। কর্মচারীরা ২ ঘণ্টা ডিউটি করে কি না সন্দেহ আছে। যত দ্রুত পারি এই অঞ্চল ছেড়ে পালাতে চাই। বৃহস্পতিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য লাইব্রেরির তিনতলা ভবনে ৯০টি ডেস্ক এবং টেবিলে ৪৮০টি আসনসহ সর্বমোট ৫৭০ টির মত আসন রয়েছে। এ হিসাবে প্রতি ২৫ শিক্ষার্থীর জন্য একটি আসন। এর বাইরেও অনেক সাবেক শিক্ষার্থী চাকরির জন্য পড়তে প্রতিদিন লাইব্রেরিতে আসেন। লাইব্রেরি ব্যবহারকারীদের জন্য বাথরুম আছে ১০টি, যার দুটি ব্যবহার অনুপযোগী। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের কমনরুমে ১২ থেকে ১৫টি দৈনিক পত্রিকা রাখা হলেও লাইব্রেরিতে মাত্র ৭টি বাংলা এবং ২টি ইংরেজি পত্রিকা রাখা হয়। এখানে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক কোনো নামাজ কক্ষ নেই। নামাজ কক্ষ অত্যন্ত ছোট হওয়ায় প্রত্যেক ওয়াক্তে দুই থেকে তিনবার জামাত করে নামাজ আদায় করতে হয়। লাইব্রেরির যে ওয়াশরুম গুলো রয়েছে সেগুলোর বেহাল দশা। নিচতলার ডানদিকে শিক্ষার্থীদের পড়ার  টেবিলের পাশেই ওয়াশরুম থেকে পানি বের হয়ে জমে আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ ভবনে ছোট পরিসরে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৫ সালে লাইব্রেরির মূল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর ৫৫ হাজার বর্গফুটের কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি ৪৫ হাজার বর্গফুটের কাজ আজও শেষ হয়নি। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন ভিসি আ ফ ম কামাল উদ্দিন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য খুলে দেন বর্তমান লাইব্রেরিটি। ভবনটির অসম্পূর্ণ অংশ গত ৩২ বছরেও সম্পূর্ণ না হওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও আসন অপ্রতুল। দক্ষ জনবলের অভাবও প্রকট এ লাইব্রেরিটিতে। বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রয়োজন থাকা সত্ত্ব্বেও লাইব্রেরিতে জনবল নিয়োগের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে সিলেবাসভিত্তিক বই কেনা হয়নি। আর নামমাত্র অন্যান্য যে কয়টি বই কেনা হয়েছে তা শিক্ষার্থীদের কোনো কাজেই আসে না। বর্তমানে সিলেবাস ভিত্তিক বইয়ের সংকট চরমে পৌঁছেছে । বর্তমানে এতে বই রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজারের মত। কিন্তু সিলেবাসভিত্তিক বই না কেনায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। বইয়ের দাম খুব বেশি হওয়ায় কিনে পড়া তাদের জন্য দুঃসাধ্য। আবার সিলেবাসভিত্তিক অধিকাংশ বই শিক্ষকরা উঠিয়ে আর জমা দেন না। অনেক শিক্ষার্থী আবার শিক্ষকের নাম ভাঙিয়ে বই ইস্যু করে পরে তা আর ফেরত দেন না। অধিকাংশ বইয়ের পৃষ্ঠা বা ছবি থাকে কাটা-ছেঁড়া। বই কাটা ও জমা না দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইন না থাকায় এ প্রবণতা অনেক বেশি। এদিকে এ বছরের জুন মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ শীর্ষক ১ হাজার ২০৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকে পাস হয়। এই প্রকল্পটির আওতায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সাততলাবিশিষ্ট নতুন লাইব্রেরি ভবন নির্মাণেরও কথা রয়েছে। লাইব্রেরির ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. অজিত কুমার মজুমদারের সঙ্গে এসকল সমস্যার বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ” আমি লাইব্রেরির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অনেক সমস্যার সমাধান করেছি। প্রায় দেড়শ আসন বাড়ানো হয়েছে। এখন ভবনে জায়গা না থাকলে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করবো কীভাবে? তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন লাইব্রেরির জন্য যে বাজেট রাখে সেটা অপ্রতুল। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক কিছুই করতে পারি না। তবে আমি চেষ্টা করবো দ্রুত এসকল সমস্যা সমাধানের জন্য।