আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্রীশ্রীশারদীয় দুর্গোৎসব

0
722

নকুল দেবনাথ (নান্টু), মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি তোমার বন্দনা মা গো করি ঘরে ঘরে। সর্বশক্তিময়ী পরমেশ্বরী মহাশক্তির অন্যতম প্রকাশ, মহাদেবী শ্রীশ্রীদুর্গা আবির্ভূতা দেব-মানবের পরমকল্যাণে। যিনি বিশ্বজগতের চালিকাশক্তিরুপে সর্বত্র, সর্বভূতে সর্বসময় নিত্য ক্রিয়াশীল পরম মমতায়। আগামী ১৪ অক্টোবর সায়ংকালে শ্রীশ্রীশারদীয়া দুর্গাদেবীর বোধনের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্রীশ্রীশারদীয় দুর্গোৎসব। এ উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দুর্গা প্রতিমা। পূজা ঘনিয়ে আসায় শ্রীমঙ্গলের পাড়াগুলোতে যেন দম ফেলার ফুরসতবনেই কারিগরদের। কাজের চাপ বেশি থাকায় পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করছেন বাড়ির নারীরাও।

এখন চলছে বাঁশ, খড় আর কাঁদা মাটি দিয়ে প্রতিমার অবকাঠামো তৈরি ও প্রলেপ দেয়ার প্রাথমিক কাজ। কাঁদামাটি দিয়ে পরম যত্নে দেবীর মুকুট, হাতের বাজু, গলার মালা, শাড়ির পাড়, প্রিন্ট ও ঠাকুরের চুল তৈরি করছে। এরপর প্রতিমাতে দেওয়া হবে রং তুলির আঁচড়। দৃষ্টিনন্দন আর নানা বৈচিত্রময় ভঙ্গির এসব দেবী মূর্তিগুলো শৈল্পিক প্রশংসা কুড়ালেও এসব মৃৎ শিল্পি। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন মন্দিরগুলোতে মূর্তি কারিগরদের ব্যস্ততা এখানে প্রায় শতাধিক দূর্গা প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিমা তৈরির জন্য বাঁশ, খড়, মাটিসহ অন্যান্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি প্রতিমার মূল্য। তবে আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও পৈত্রিক এ পেশা ধরে রাখতেই কাজ করছেন প্রতিমা তৈরির কারিগররা। মূলত প্রতিমা তৈরি করেই চলে এদের সংসার। পূজার একমাস আগ থেকে শুরু হয় প্রতীমা তৈরির কাজ। এবারও শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এখানে প্রতিমা তৈরির ধুম পড়েছে।

সকাল থেকে রাত অবধি চলছে প্রতীমা তৈরি। প্রতি বছর দুর্গাপূজায় শ্রীমঙ্গলের তৈরি প্রতিমা মৌলভীবাজার জেলাসহ আশপাশের হবিগঞ্জ, সিলেট ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়। বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার দপ্তর সম্পাদক নকুল দেবনাথ (নান্টু) বলেন, শ্রীশ্রীশারদীয়া দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব। শুরু হয় দেবীপক্ষে, শুরুর পর্বের নাম ‘মহালয়া’, মহালয়াতে দেবীদুর্গাকে পিত্রালয়ে আবাহন জানানো হয়। মহালয়ার পরের দিন দ্বিতীয়া, এভাবেই তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমী। এ দশ দিনের মধ্যে মহালয়া এবং সপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী এবং দশমী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহালয়া দিয়ে শুরু, দশমীতে এসে শেষ। বিজয়া দশমী হচ্ছে দেবীদুর্গাকে ঘটা করে বিদায় সংবর্ধনা জানানো, পিত্রালয় থেকে চোখের জলে ভেসে দেবীর স্বামীগৃহে প্রত্যাবর্তনের দিন। দশমীতে ভক্তকুলের মনে বিষাদের ছায়া নেমে আসে, স্বর্গ থেকে মা এসেছিলেন তার সন্তানদের মাঝে, মা আবার ফিরে যাবেন স্বর্গে, ভেবে ভক্তকুলের চোখ ভিজে ওঠে, মন ভারি হয়। মা’কে কপালে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে, ধানদুর্বা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনিতে চারদিক মাতিয়ে তুলে, চোখের জলে ভেসে এয়োস্ত্রীরা মা’কে প্রণাম করে মায়ের চরণে সিঁদুরের কৌটা ছুঁইয়ে স্বামী সন্তানের মঙ্গল প্রার্থনা করে।

এরপরই দেবীমূর্তিকে খোলা ট্রাকে বসিয়ে ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে ভক্তদের শোভাযাত্রা বের হয়। বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল ৬নং আশিদ্রোন ইউনিয়ন শাখার সভাপতি পূর্ণেন্দু দেবনাথ বলেন, আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হবে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এই উৎসবকে ঘিরে আশিদ্রোন ইউনিয়নের ২৪টি পূজা মণ্ডপে দূর্গা প্রতিমা নির্মাণের কাজ এখন শেষের পথে। বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল ২নং ভুনবীর ইউনিয়ন শাখার সভাপতি  অশোক দেব জানান, সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে, এবছর দেবীদুর্গা মহালয়ে আসছেন ঘোড়ায় চড়ে, আর যাবেন সুয়ারিতে চড়ে। আসন্ন দুর্গাপূজার সব ধরনের প্রস্তুতির কাজ চলছে। ভুনবীর ইউনিয়নের ১৮টি পূজা মণ্ডপে এখন সারি সারি সাজানো হচ্ছে নানা আকারের দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ আর মহিষাসুর-সঙ্গে দেবীর বাহন। এছাড়াও এবার ভুনবীর ইউনিয়নের পূজার বিশেষ আকর্ষণ হলো দেবীদুর্গার একশত হাত এর পূজা। তিনি বলেন, প্রথম বারেরমত এবার ভুনবীর ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামে দেবীদুর্গার একশত হাত পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এই পূজা দেখার জন্য তিনি সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি সনজয় রায় রাজু বলেন, সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শ্রীশ্রীশারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন শ্রীমঙ্গলের প্রতিমা শিল্পী, পূজা উদযাপন কমিটি ও প্যান্ডেল মঞ্চের কারিগররা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে পূজোর আগের আনুষ্ঠানিক সভা। প্রতিবছরের শরৎকালে দেবীদুর্গার এই আগমন হয় নিজ ভূমিতে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, এবার দুর্গা দেবী আসছেন ‘ঘোটকে চড়ে ফল- ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে ও গমন করবেন দোলায় ফল- দোলায়ং মড়কং ভবেৎ। হিন্দু শাস্ত্রমতে দেবীদুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাধারণ-সম্পাদক সুশীল শীল বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় সার্বজনীন ১৫৫ টি ও ব্যক্তিগত ১৩ টি সর্বমোট ১৬৮ টি পূজা মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হবে।

শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেএম নজরুল বলেন, শারদীয় দূর্গোৎসব শ্রীমঙ্গলে ব্যাপক আকারে হয়। এই কারণে শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রতিটি পূজা মণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকবে। পুলিশ প্রশাসন ও আনসার সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখবেন। এছাড়াও পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষথেকে প্রত্যেকটি পূজা মন্ডপে ভলেন্টিয়ার নিয়োগ দেওয়া হবে। তাছাড়া পূজামণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থাও থাকবে।