“অপরাধ  বোধ”

0
369

সিমু  আর ইমা  দুই বান্ধবী ।দুজনের মধ্যে  সারাক্ষণ বাকবির্তন্ড লেগেই আছে ।তাদের  কথোপকথন ইমা কি করসি রে ? তোকে  যে  আমি  এত করে  ডাকছি।শুনতে  পাচ্ছিস না ? সারাদিন  মোবাইল ফোন  নিয়ে  বসে  থাকবি? পড়াশোনা করতে হবে না ।পরীক্ষা তো  চললে  আসলো।শোন  সিমু  কানের  সামনে এসে  ঘ্যানর ঘ্যানর করবি না ।তোর  ঝালায়  আমি  অতিষ্ঠ ।দূর  হয়ে যা  সামনে থেকে ।ইমা  এবার  কিন্তু  বাড়াবাড়ি করছিস। আমি  কাকুকে  কল করে  জানাবো যে তুই মোটেও  পড়াশোনা করিস না ।যা বল গিয়ে ।দেখি তোর  কাকু আমার  কি করে? আমার  যা ইচ্ছে তাই করবো।যা ইচ্ছে কর।আমি  পড়তে  বসলাম ।বাহিরে  কি সুন্দর! বৃষ্টি হচ্ছে।সিমু  বৃষ্টি খুব ভালোবাসে । সিমু  জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি  পড়া  দেখছে।জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি  ছুঁয়ে ছুঁয়ে  দেখছে।এমন  সময়  তার  মোবাইল ফোন  বেজে উঠলো ।মোবাইলে  তাকিয়ে দেখলো তার  বাবা  কল করেছে।সে ঝটপট  মোবাইল হাতে নিয়ে  কল রিসিভ করে  বাবার সাথে কথা বললো।বাবার সাথে কথা বলে মোবাইল টেবিলে রাখলো।সিমু  আবার  বৃষ্টি  পড়া  দেখছে।বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দে  সিমু  গান গাইতে  শুরু করলো।সিমু  যেই গান  গাইতে শুরু করলো ইমা এসে  বাঁধা দিলো।সিমুকে বললো চল দুজনে  একসাথে ছাদে যাই।ছাদে গিয়ে  বৃষ্টিতে ভিজি।সিমু  বললো না।জ্বর আসেতে পারে ।সামনে  পরীক্ষা ।ইমা  সিমুর কথায়  জেদ  চেপে  বললো  “আজ দুজনে  বৃষ্টিতে  ভিজবোই ” জ্বর  আসলে আসুক । আমি  তোর কথা  শুনবো না ।চল ছাদে যাই।ইমা  সিমুকে  জোর করে  ছাদে  নিয়ে  যায়।দুজনে  ইচ্ছে মতো  বৃষ্টিতে ভিজে ।সিমুর রাতে  জ্বর  চলে  আসে।সিমু জ্বরে  প্রলাপ  বলতে থাকে।  কি করে পরীক্ষা  দিবে? ইমা ওর  কথা শুনে  ভয়  পেয়ে  যায়।মনে মনে ভাবে  সিমুর  যদি উল্টোপাল্টা  কিছু  হয়ে যায়।তাহলে চিরকাল  দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকবে।ইমা  ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে “সিমু  যেন  তাড়াতাড়ি  সুস্থ হয়ে  উঠে”।ইমা  সিমুর  বাবাকে  কল করে  ওর  কথা  জানায়।সিমুর বাবা খবর পেয়েই  চলে আসে  সিমুকে দেখতে।সিমুকে  ডাক্তারের কাছে নিয়ে  যান।ডাক্তার  সিমুকে  চেক আপ করে  কিছু  ঔষুধ  খেতে  পরামর্শ দেন । কয়েক দিন  পর  সিমু  সুস্থ হয়ে উঠে।আবার  পড়াশোনা নিয়ে  ব্যস্ত হয়ে উঠে ।ইমা ও  পড়ায়  মন দেয়। সিমু  আর ইমা  দুজনেই  ভার্সিটিতে  ভর্তির সুযোগ পায়।সিমু  আর ইমা  দুজনে ভার্সিটিতে  ভর্তি হলো।দুজনে  মনযোগ দিয়ে  পড়াশোনা  চালিয়ে যাচ্ছে ।হঠ্যাৎই  সিমুর  জীবনে  আমুল পরিবর্তন চলে এলো।ইমার চোখে  ব্যাপারটা  ধরা পড়লো।ইমা  সিমুকে  জিজ্ঞেস করলো  কি হয়েছে তোর? সিমু  কিছু  বলতে চাইলো না ।ইমা ও নাছোড়বান্দা  বিষয়টা না জেনে  সিমুকে  ছাড়বে না ।ইমার  জেরার মুখে  সিমু মুখ  খুললো।ইমা সিমুর কথা  শুনে  হাসিতে  ফেটে  পড়লো। সিমু  একটা  ছেলেকে  পছন্দ করে ।কিন্তু  ছেলেটা  ওকে  পাত্তা দেই না । এই  কারণে  তার  মনের ভিতরে  চলছে উথাল পাতাল  টেউ।পড়ালেখা করতে  তার ভালো লাগে না ।কোন  কিছুতেই  মন বসে না ।ইমা  সিমুকে  বুঝানোর চেষ্টা করে ।এসব মায়া  ছাড়া কিছুই নয়।দুদিন পর  মোহ কেটে যাবে ।সিমু  তুই  আবার  পড়ালেখায় মন দে।তুই  আর  আমি  পড়াশোনা শেষ করে  বড়  চাকুরী করব। আমরা  আমাদের  বাবা আমার  মুখ উজ্জ্বল করব।সিমু  ধীরে ধীরে  ওই অবস্থা থেকে  বের হয়ে আসে।পড়াশোনা নিয়ে  ভীষণ ব্যস্ত ।প্রতিটি  সেমিস্টারে  ভালো  রেজাল্ট করছে।ভার্সিটির  ফাইলান  সেমিস্টার পরীক্ষা চলছে ।সিমু  আর  ইমা  পরীক্ষা দিয়ে  হলে  যাচ্ছে ।সেই  সময়  পিছন থেকে  একটি  ছেলে  তাদের  ডাকছে।সিমু  আর  ইমা  পিছন ফিরে  তাকায় ।তাকিয়ে দেখে সেই ছেলেটা ।সিমু  যাকে  পছন্দ করতো।আজ ছেলেটা  সিমুর সাথে কথা বলতে এসেছে ।ছেলেটা সিমুকে  বলে “সে সিমুকে  খুব ভালোবাসে “।সিমু  এই কথা শুনে  অবাক হয়ে হা করে  দাঁড়িয়ে থাকে ।ইমা  তখন  ছেলেটাকে বলে তুমি  এখন  এসব কথা  বলছো কেন? এখন  এসব কথার কোন  দাম নেই ।তুমি  আগে  আমার  বন্ধুকে  অনেক কষ্ট দিয়েছো।তুমি  চলে যাও ।সিমু  নিঃশব্দে  দাঁড়িয়ে  তাদের  কথা শ্রবণ করলো।সিমুর কোন  সাড়া না পেয়ে  ছেলেটা  চলে গেলো।ইমা  সিমুকে নিয়ে  হলে গেল ।সিমু  হলে গিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে   কাঁদতে  লাগলো ।ইমা  ওকে  বললো  তুই বোকার মত  চোখে জল  ফেলছিস কেন? আমরা  আর  পিছন ফিরে  তাকাবো না।সামনে  আমাদের  অনেক  কঠিন  পথ পাড়ি দিতে হবে ।সিমু একটু  ভেঙে পড়লো।পরীক্ষা শেষ ।দুই বান্ধবী  বাড়ি ফিরে গেলো।কিছু দিনের মধ্যেই তাদের  পরীক্ষার  রেজাল্ট বের হলো।সিমু ও ইমা  দুজনেই  প্রথম  শ্রেনি  পেয়েছে । এবার  চাকুরীর জন্য  প্রস্তুতি  নিবে।দুজনে  কনফিডেন্স কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলো।আবার  এম.এসসিতে ভর্তি হলো ।ভর্তির কিছু দিন পর ক্লাস শুরু হয়ে গেলো।পড়াশোনা  আর চাকুরির  পরীক্ষার  প্রস্তুতি দুজনের  পুরোদমে  চলছে ।হঠ্যাৎই   ইমার  বাবা  সড়ক দুর্ঘটনায়  মারা যান ।ইমা  বাবাকে  হারিয়ে  নিস্তব্ধ হয়ে যায়।সংসারে হাল ধরতে হলো ।ইমারা  তিন ভাই বোন ।ইমাই  পরিবারের  বড়  ।ভাই  আর বোন  ছোট ।মেয়েটার সবে  পড়াশোনা শেষ  হচ্ছিল। বাবাকে হারিয়ে  অথৈ সাগরে পড়ে গেল ।ইমার  বাবা  সরকারি  জব করতো।বাবার  পেনশন  আর জিপি ফান্ডের টাকা তোলার জন্য  ইমা  দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো।ইমার  পড়াশোনার পাঠ  চুকে গেল ।তার  আর এম.এসসি পরীক্ষা দেয়া হলো না ।এদিকে সিমু এম.এসসি শেষ করলো।পাশাপাশি  কোচিং সেন্টারের নিয়মিত  যাওয়া আসা করতো।চাকুরীর জন্য ভালোই প্রস্তুতি নিচ্ছে ।ইমা  পরিবারের  দায়িত্ব কর্তব্য পালনে  ব্যস্ত ।বিসিএস পরীক্ষার  সার্কুলার  প্রকাশিত হয়েছে ।সিমু  ইমাকে  কল করে  জানায় ।দুজনে  একসাথে  অনলাইন  আবেদন করে।সিমু  বিসিএস পরীক্ষার জন্য  দিনরাত  কাটে।ইমা  তেমন  পড়াশোনা করতে পারে না ।পরিবারের হাল  ধরতে গিয়ে টিউশন করে, কোচিং সেন্টারে পড়ায়।এভাবেই তার  দিন কেটে যায়।বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা  অনুষ্ঠিত হলো ।সিমু আর ইমা  একসাথে  পরীক্ষা দিতে ঢাকা গেলো ।দুজনে  পরীক্ষা দিয়ে  ট্রেনে করে  ফিরছিলো।ট্রেনে এক বিসিএস  কর্মকর্তার সাথে তাদের পরিচয় হয়।সিমু আর ইমা সেই বিসিএস কর্মকর্তার সাথে গল্পে  মেতে  ওঠে ।বিসিএস  কর্মকর্তার নাম রতন। রতন সাহেব পরেই  স্টেশনে  নেমে  যাবেন। সিমু আর ইমাকে নামার আগে  একটা  ভিজিটিং কার্ড দিলেন।রতন সাহেব  ট্রেন থেকে নেমে গেলেন।সিমু আর ইমা বাড়ি  ফিরবে।বাড়ি ফেরার পথে  রতন সাহেবকে নিয়ে  গল্প করছে।ইমা  সিমুকে বললো  ইস!লোকটা কি ভালো ।কি সুন্দর ব্যবহার ।কি মধুর  কন্ঠস্বর ।সিমু  তখন  ফাজলামি করে বলে  বুঝতে পারছি তুই ওই  লোকের  প্রেমে  পড়েগেছিস।ইমা  সিমুকে বললো  ফাজলামি করবি না ।আমি  শুধু বললাম  লোকটা অনেক  ভালো ।কথা বলতে বলতে  দুজনে  দুজনে  বাড়ি  গেল।কিছু দিন পর বিসিএস  প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল  বের হলো।সিমু আর  ইমা  দুজনেই  প্রিলিমিনারিতে উর্ত্তীন হলো।এবার  লিখিত পরীক্ষার জন্য  দুজনে  মাথা বেঁধে  লাগলো।ইমা সাংসারিক ঝামেলা  সামলে  দিন রাত  পড়াশোনা করতো।সিমু আরাম আয়েশ করে  পড়াশোনা করে যাচ্ছে ।লিখিত পরীক্ষা দিলো।লিখিত পরীক্ষা দিয়ে  তারা  হাফ ছাড়লো।পড়াশোনা থেকে   একটু বিরতি নিলো।একদিন  সিমু  সেই  রতন সাহেবকে  কল করলো।রতন সাহেব  কল  রিসিভ করে কথা বললেন ।তারপর থেকে  দুজনে মাঝে  প্রায়শই কথা হতো।কথা বলতে বলতে দুজনে মাঝে  একটা ভালো  সম্পর্ক গড়ে ওঠে ।সিমু  ব্যাপারটা  ইমাকে  আড়াল করে ।রতন  আর  সিমুর  সম্পর্ক চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হলো ।সিমু  সারাদিন রাত  মোবাইল নিয়ে  ব্যস্ত থাকে।একদিন  ইমা সিমুকে  অনেক বার কল করে ।সিমু  ইমার  কল রিসিভ করে না ।ইমার  খুব  অভিমান হয়।সেদিনের পর থেকে  ইমা  আর সিমুকে  কল করে  না।সিমু  রতন সাহেবকে  নিয়ে  ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।ইমার কথা  একদম  ভুলে যায়।এদিকে  ইমার  প্রবাসী  এক ছেলে সাথে  বিয়ে হয়ে যায়।ইমার  মা সিমুদের বাড়িতে গিয়ে  নেমন্তন্ন  দিয়ে আসে।সিমু  বিয়েতে  আসে না।ইমার  বিয়ে করে  বরের বাড়ি চলে যায়।সিমুর সাথে  আর দেখা হয় না ।বিসিএস  লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়।ইমা  আর  সিমু  দুজনেই  উর্ত্তীন হয়।দুজনে একদিনেই  ভাইভা  দিতে  যায়।এবার  দুজন  দুজনের  মুখোমুখি ।সিমু  ইমাকে  জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।সিমু  ইমাকে বলে  তোর সাথে আমার অনেক  কথা  আছে।পরীক্ষার পর  কথা  বলবো।তুই  কিন্তু  আমার  সাথে  দেখা না করে  যাবি না ।সিমুর  এ অবস্থা দেখে  ইমার  সব  অভিমান  শেষ হয়ে যায়।ভাইভা পরীক্ষা দিয়ে  সিমু  ইমার জন্য  অপেক্ষা করছে।একটু পর ইমা ও  ভাইভা দিয়ে বের হলো।তারপর  দুই বান্ধবী  গোশগল্পে  মেতে উঠলো।সিমু  ইমাকে  রতনের কথা  শেয়ার  করলো।ইমা  সিমুকে বললো  রতন  কি তোকে  বিয়ে  করবে? নাকি  শুধুই  টাইম পাস ? সিমু  তখন  বললো  আমি  বুঝতে পারি না ।আমি  ওকে  পাগলের মতো ভালোবাসি ।ওকে  ছাড়া  আমি  বাঁচতে পারবো না ।ইমা  বললো  পাগলের  প্রলাপ  বকিস না ।এসব  ইমোশনাল কথা  ছাড়।তুই কি কখনো  রতনের সাথে  দেখা করেছিস।সিমু বললো না।রতন  কি কখনো  তোর সাথে দেখা করতে চাইনি।সিমু  বললো  অনেক বার চেয়েছে।আমি  বলেছি  ক্যাডার হয়ে  তার সাথে দেখা  করবো।ইমা  তখন  সিমুকে  বললো  যদি  ক্যাডার না হতে পারিস তাহলে কি হবে? তুই কি  ওকে  ভুলে যাবি।সিমু  চিন্তায় পড়ে গেলো।সিমু  বললো  আমি  এত কিছু  ভাবিনি ।শুধু জানি  ওকে  ভালোবাসি । বিরতিহীনভাবে  দুজনে  কথা বলেই যাচ্ছে ।সেদিন  ইমা সিমুর সাথে  ওদের  বাড়ি  যায়।রাতেও  দু’বান্ধবী মিলে  গল্প  করে।হঠ্যাৎ ইমার  স্বামী কল করে।স্বামীর সাথে  দীর্ঘক্ষণ  আলাপ করে।এদিকে সিমু  ইমার  জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।সিমু ইমাকে বলে  রোজ  তো কথা বলিস দাদার সাথে ।আজ  রেখে দে।আজ  রাতে  আমার সাথে গল্প কর।ইমা  সিমুর কথা মতো কাজ  করলো।সিমু  এবার  ইমাকে  চেপে  ধরলো তাদের  দাম্পত্য জীবনের কথা বলতে ।ইমা  একটু  বিভ্রান্তিতে  পড়ে গেল ।কি বলবে  সিমুকে ।ইমা  বলা শুরু করলো।তোর  দাদার সাথে হঠ্যাৎই বিয়ে  ঠিক হয়েছিল ।ভদ্রলোক মাত্র  এক  মাসের  ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিল ।বিদেশে  ফিরে  যাওয়ার  মাত্র  দশ দিন আগে আমাদের  বিয়ে হলো।বিয়ের  আনুষ্ঠানিকতা শেষ  হতে না হতেই  চলে গেল । সিমু  খুব  উৎসাহ নিয়ে  ইমাকে  তাদের  ফুলশয্যার কথা  জিজ্ঞেস করলো।ইমার  মুখটা  একটু  ফ্যাকাশে হয়ে গেল ।সিমু  বললো  কি হলো? বলবি না  আমায়। ইমা  বললো  অন্য  সব  বিবাহিত  দম্পতিদের  মতো  আমাদের  ফুলশয্যা হয়নি।আমার  স্বামী  বলেছে  আগে  আমাদের  মধ্যে  প্রেম  , ভালোবাসার  সম্পর্ক গড়ে উঠবে  তারপর  নাকি  ফুলশয্যা হবে । সিমু  বলে  উঠলো  এসব কি  বলছিস? সামাজিক  স্বীকৃতি  পেয়েও  ভদ্রলোক  ফুলশয্যা করতে রাজি  হলো না ।ইমা  ভদ্রলোক বিচিত্র  ধরনের ।আমার  উনাকে  খুব  পছন্দ হয়েছে ।উনি তো  বিদেশে  চলে গেছেন ।এই  এক বছর  আমরা  দুজন দুজনকে  ভালো করে  চিনবো জানবো।উনার  ভালো লাগা মন্দ লাগা সব কিছু  জানবো।ধীরে ধীরে  আমরা  একে অপরের সন্নিকটে চলে আসবো।প্রেম  আর ভালোবাসায়  মুখরিত হয়ে উঠবে  আমাদের  আলাদা ভুবন।সিমু  ইমার কথাগুলো  মন দিয়ে  শুনছে।এই দুনিয়াতে  এও সম্ভব ।সিমুর  মুখটা  ভারী হয়ে যায়।সিমুর চোখ  দিয়ে  পানি ঝরছে ।ইমা  বললো  সিমু  কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন? সিমু বললো  আমি  তোর  মতো কেন হতে  পারলাম না ? ইমা  জানিস  আমি  রতনের সাথে  শরীরবৃত্তীয়  চ্যাট করি। যখন  ওর সাথে চ্যাট করি  তখন  রতনকে খুব  মিস করি ।ইমা সিমুর কথা শুনে  হতভম্ব হয়ে গেল।অতঃপর  ইমা সিমুকে বললো এসব কথাবার্তা হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার ।কিন্তু  তোর  আরোও  সচেতন হওয়া উচিত ছিল ।যাইহোক  এসব বাদ দে ।এখন  বলতো  রতন কি  আদৌ  তোকে বিয়ে করতে চাই কিনা? সিমু বললো  আমি একদিন  জিজ্ঞেস করেছিলাম  “রতন তুমি কি আমাকে  বিয়ে করবে? “রতন  উত্তর দিয়ে ছিল  হ্যাঁ ।তুই কি রতনের কথা  পুরোপুরি  বিশ্বাস করতে পেরেছিস।সিমু বললো  আমি  রতনকে খুব বিশ্বাস করি ।রতনকে  আমি  আমার  মন ও প্রাণ দিয়ে  ভালোবাসি।রতন আমার ধ্যান, জ্ঞান সব কিছু ।সারাক্ষণ শুধু  ওর কথাই  ভাবতে  ভালো লাগে । রতনকে নিয়ে   আমি  ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখি ।ইমা  জানিস  আমি না মা হওয়ার স্বপ্ন দেখি।রতন  আর  আমার  ঘর  আলো করে ছোট্ট  একটা শিশু  আসবে।আমি  শিশুটিকে অনেক অনেক আদর সোহাগ করবো।সবই  বুঝলাম  সিমু ।সিমু  তুই রতনকে  তোর  মনের  সব কথা খুলে  বলেছিস? সিমু  বললো  রতন  সব  জানে।এবার  বলো  রতনের  ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? সে কিভাবে কি করতে চায়? রতন  বলেছে তার মামা  দেশে  ফিরলে  বিয়ের  ব্যাপারে কথা বলবে।মামা দেশে ফিরলে মানে!!!রতন  বলেছে মামা  ছাড়া  সে একা কিছু  সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না ? সিমু  আমার  এধরনের কথা  পছন্দ হলো না ।জানিস  ইমা  আমারও  মনে  খটকা লাগে ।বুঝতে পারি না আমি  পুরোপুরি ওকে।ইমা  আমি এখন  কি করবো ? কিছু  বুঝতে পারছি না ।এত চিন্তা করার কিছু নেই ।তুই ওর সাথে  সরাসরি কথা বল।ইমা  রতনের সাথে কথা বলতে  গেলে  আবেগে আপ্লুত হয়ে  যাই।ওকে কিছু বলে উঠতে পারি না ।রতনকে আমি  ভীষণ রকম ভালোবাসি।দু বান্ধবীর মাঝে  এভাবেই  কথোপকথন চলতে থাকে ।ইমা  শুশ্বর বাড়ি চলে যায়।আর সিমু  নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।সিমু  একদিন  রতনকে  মোবাইল ফোনে অনেক  বার কল দেয়।রতন কল রিসিভ করে না ।এভাবে  অনেক বার কল  দেয়ার পর  রতন  ধমকের স্বরে বলে ” এতবার  কল দিচ্ছো  কেন? কি চাই  বলো?”সিমু  রতনের  কথা  শুনে হতভম্ব হয়ে পড়ে ।সিমু  রতনের  এই ব্যবহারে  অনেক কষ্ট  পেয়ে  অঝোরে কান্নাকাটি করে ।সিমু  রতনের সাথে  যোগাযোগ বন্ধ করে  দেয়।রতন  এসএমএস করে বলে ” বিনা কারনে  ভুল  বুঝতেছ”।সিমু  এতই কষ্ট পায় এক মাস  কোন  এসএমএস করে না ।রতন  ও কোন  খবর নেয় না ।সিমু  রতনের  জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে  নিজে কার্ড  বানায় ।কার্ড  ও চকলেট  কুরিয়ার করে  পাঠায়।রতন  গিফট  পেয়ে  এসএমএস করে  বলে “এগুলো  পাঠাতে গেলে কেনো?” সিমু  এর উত্তর  পাঠায়।তারপর  আবার  দুজনের  মাঝে  যোগাযোগ  শুরু  হয়।দুজনে  সুন্দর  সময়  কাটাতে থাকে।সিমু খুশির  জোয়ারে ভাসতে থাকে ।হঠ্যাৎই  সিমু  লক্ষ্যে করে  রতন  আগের মতো  তাকে  সময়  দিতে  চায় না ।কারণটা কি  ছিলো  সে বুঝতে পারে না ।সেও  মনে মনে বলে  রতনকে  নিজে থেকে আর নক করবো না ।যে ভাবনা  সেই  কাজ। আবার  যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল । হঠ্যাৎই জানতে  পারলো রতন  বিয়ে  করেছে এক মেডামকে ।তার  বাড়ি সিলেট । সিলেটের  কিশোরীমোহন বালক সরকারি  প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে।সিমুর  মাথায়  আকাশ  ভেঙ্গে পড়ে ।সিমু  হাঁউমাঁউ করে  কান্নাকাটি করে ।কিছুতেই  সামলাতে পারছিলো না  নিজেকে ।তবুও  রতনকে  এসএমএস করে  শুভ কামনা জানিয়েছে।রতন  সিমুকে  ব্লক করে দিয়েছে ।সিমুর  সব  স্বপ্ন  ভেঙে গেছে ।রতন  মিথ্যে  ভালোবাসার  ছলনা করেছে ।সিমু  একটুও  ঠের  পাইনি।সিমুর  সাজানো গোছানো জীবন  এলোমেলো হয়ে গেছে।রতন  সাহেবের কি লাভ  হলো এমন  ছলনার  আশ্রয় নিয়ে ? সিমু  ভেবে পায় না  কি করবে? সিমু  ইমাকে  কল করে সব কথা  জানায়। ইমাও বান্ধবীর জীবনের  চরম বিপর্যয়ে ভেঙে পড়ে । ইমা সিমুকে  সামলানোর ভাষা খুঁজে পায় না । এভাবেই দিন  কেটে যাচ্ছে ।সিমু  কিছুতেই  রতনকে  ভুলতে পারে না ।একবার  সিদ্ধান্ত নেয়  আত্মহত্যা করবে। সিমু  আত্মহত্যার পথ থেকে সরে আসে।একদিকে  বিসিএস  ভাইবা পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়।ইমা আর সিমু দুজনেই উর্ত্তীন হয়।তবে ক্যাডার পদ পাইনি ।নন ক্যাডারে চান্স পায়। দুজনেই নন ক্যাডার পদে  যোগদান করে।সিমু  আর ইমা  কর্মক্ষেত্র নিয়ে  ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।ইমার  বেশি কাজ করার  সুযোগ  হয়নি ।সে স্বামীর সাথে বিদেশে  পাড়ি  দেয়।সিমু  একদম  একা  হয়ে যায়।কাজ থেকে  বাড়ি  ফিরে  মন ভার করে বসে থাকে।রতন সাহেবের সাথে কাটানো দিনগুলোকে  সে  আরোও  বেশি বেশি করে  মিস করতে থাকে।সিমু  এমনি খুব  চ্যাপা স্বভাবের মেয়ে।নিজের  মনের কথা কারোও  সাথে শেয়ার করে না।ইমাকে আর রতনকেই  শুধু মনের কথা বলতে  পারতো।সিমুর  পরিবার  ওর বিয়ে  ব্যাপারে ভাবে।সিমু  কিছুতেই  বিয়ে করতে রাজি  হয় না।সিমু এখনো   রতনকেই  ভালোবাসে ।সিমুর  ভাষ্য অন্য কাউকে বিয়ে করলে  তাকে নাকি  ঠকানো হবে? সে এমন  কাজ করতে চায় না ।নিজের  অবস্থানে  সৎ  থাকতে চায়।সিমু  বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ? কি করে  অন্য  কাউকে বিয়ে করে  সংসার ধর্ম পালন করবে ? সিমুর  মা  হওয়ার খুব  শখ ছিল ।ঈশ্বর জানেন  সিমুর  ভবিতব্য কি? ইমার  একটা  মেয়ে  হয়েছে ।এই আনন্দের  সংবাদে  সিমু খুব খুব খুশি ।সিমুর  চোখে  ভেসে ওঠে  তার  পুরানো স্মৃতিগুলো ।সিমু  নীরবে চোখের জল ফেলে । ইমা সিমুকে বলে  তুই  পুরানো সব কিছু  বাদ  দিয়ে  নতুন করে  শুরু কর।দেখবি তোর  ভালোই হবে ।পরিবারের  মতামতের ভিত্তিতে  একটা  বিয়ে কর।তারপর  তোর  স্বপ্নপূরণের চেষ্টা কর।ঈশ্বর  চাইলে  তোর  ঘর  আলো করে  ছোট্ট একটা বেবি  আসবে।সংসারের  মায়ায় জড়িয়ে গেলে  তোর  কষ্ট  ঘুচে যাবে ।সিমু  সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না? কি  করা উচিত হবে? ইমা  প্রবাসে  স্বামী ও সন্তান নিয়ে  সুখের  সংসার করছে।সিমু  নিঃসঙ্গ জীবন  অতিবাহিত করছে——।সিমুর  মনের  ভেতর  একটাই  প্রশ্ন  সবসময়ই  ঘুরপাক খাচ্ছে -“কি অপরাধ করেছিল  সে ? ” তাকে  এভাবে কেন  ঠকানো হলো ? রতন কোন জনমের  প্রতিশোধ নিলো ??  রতনকে  সত্যিকারের ভালোবাসা  কি অপরাধ ছিলো? সেই  অপরাধের  গ্লানি কি সিমু  সারাজীবন  ধরে  বয়ে  চলবে?

লেখাঃ সীমা রানী সরকার, প্রধান শিক্ষক ভোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীমঙ্গল।