ইজতেমা মাঠের লাশ নিয়ে দু’পক্ষের টানাটানি

0
123

মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাবিব, স্টাফ রিপোর্টারঃ

টঙ্গী ইজতেমার তাবলিগ জামাতের দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারীদের সঙ্গে মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীদের সংঘর্ষে মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ইসমাইল মন্ডল (৬৫) নামের এক মুসল্লি নিহত হয়েছেন। ওই সংঘর্ষের ঘটনায় আরও পাঁচ শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দুটি পক্ষ।


এই ঘটনায় ২ ডিসেম্বর, রবিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে সংবাদ সম্মেলন করেছে মাওলানা জুবায়েরপন্থি মুসল্লিরা। সংবাদ সম্মেলনে তারা সংঘর্ষের সময় পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একইসঙ্গে সাদপন্থি ওয়াসিফুল ইসলাম ও শাহাবুদ্দিন নাসিমকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ছয় দফা দাবি জানানো হয়।


সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের শতাধিক মুসল্লি আহত হলেও মুন্সীগঞ্জের ইসমাইল মন্ডল আসলে কোন পক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন সেটা এখনো সুস্পষ্ট হয়নি। কারণ মাওলানা সাদের অনুসারীদের দাবি নিহত ইসমাইল মন্ডল সাদপন্থি ছিলেন। সাদ বিরোধীদের হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন।

অপরদিকে তাবলিগ জামাতের সাদবিরোধী ও হেফাজত ইসলামপন্থি কওমি আলেমদের দাবি নিহত ইসমাইল মন্ডল ছিলেন তাদের অনুসারী। সাদপন্থিদের হামলাতেই তিনি নিহত হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে যা জানালেন সাদবিরোধীরা
পুরানা পল্টনের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা সাদবিরোধীদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভিক্টোরিয়া পার্ক মসজিদের ইমাম ও তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা আমানুল হক।

সাদপন্থিরা পিটিয়ে আহত করছে

মাওলানা আমানুল বলেন, ‘গতকাল টঙ্গী ইজতেমা মাঠে তাবলিগি সাথী ও মাদরাসার ছাত্রদের ওপর অত্যন্ত নির্মম ও বর্বরোচিতভাবে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। আগামী ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইজতেমাকে কামিয়াব করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে মাঠে প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হয়। এ কাজ বিভিন্ন কারণে বিলম্ব হয়েছে। ফলে তাবলিগের সাথী ও ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররা তিনদিনের জামায়াত করে মাঠের কাজে নিয়োজিত ছিল। এমতাবস্থায় নিজামুদ্দীনের মাওলানা সাদপন্থি বাংলাদেশের ওয়াসিফুল ইসলাম ও নাসিমগং-এর অনুসারীরা নিরস্ত্র-নিরীহ তাবলিগের সাথী ও মাদরাসার ছাত্র, ওলামায়ে কেরামের ওপর লাঠি-সোটা ও ধারাল অস্ত্র, ইট-পাটকেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ অবস্থায় প্রশাসনের ভূমিকা ছিল নীরব ও রহস্যজনক। পুলিশ দাঁড়িয়ে দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। শুধু তাই নয় বরং গেট ভেঙে তাদেরকে ভেতরে প্রবেশ করতে সহায়তা করেছে। কিন্তু ইতিপূর্বে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেছিল আপনারা ভেতরে অবস্থান করেন, আমরা আছি। বাহির থেকে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা গেল ভিন্ন। হামলাকারীরা ভেতরে প্রবেশ করে যাকেই সামনে পেয়েছে তার ওপরই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শত শত ছাত্র ও সাথীকে রক্তাক্ত করেছে।’
হামলায় আহত ও নিহত ব্যক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ হামলায় নিহত হয়েছেন মুন্সীগঞ্জের ইসমাইল মন্ডল ও আহত হয়েছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক; যারা টঙ্গীর আশপাশের হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেশকিছু মাদরাসার শিশু ছাত্রদের চিত্র দেখানো হয়েছে। তারা টঙ্গী মাঠের ভেতরে অবস্থিত মাদরাসার ছাত্র। তারা সার্বক্ষণিক সেখানে থেকে পড়াশোনা করে। বাহির থেকে কেউ প্রবেশ করেনি। হামলাকারীরা সেখানের মাদরাসা ভবনের মুরুব্বীদের আসবাবপত্র ভেঙে তছনছ করে অগ্নিসংযোগ করেছে।’

সাদঅনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ওয়াসিফুল ইসলাম ও সাহাবুদ্দিন নাসিমের নেতৃত্বে মাওলানা সা’দ সাহেবের অনুসারীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা ওলামায়ে কেরাম ও আলেমদের সাথী তাবলিগের সাথে বিভিন্ন জায়গায় মারমুখি আচরণ করছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল (শনিবার) টঙ্গী ময়দানে নির্মমভাবে হামলা; যা নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায়। তার নিন্দা ও ধিক্কার জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। এ হামলাতে গোটা আলেম সমাজ তথা সারা মুসলিম উম্মাহ হতবাক ও চরমভাবে মর্মাহত।’

সংবাদ সমেলনে তারা আরও কিছু দাবি তুলেছেন। সেই দাবিগুলো হচ্ছে, হামলায় আহত-নিহত মুসল্লিদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। টঙ্গী ময়দান শুরাভিত্তিক পরিচালিত তাবলিগে সাথী ও আলেমদের কাছে হস্তান্তর করা। কাকরাইলের সব কার্যকলাপ থেকে ওয়াসিফ ও নাসিমকে বহিষ্কার করা। সারা দেশে তাবলিগের সাথীদের ওপর হামলা-মামলা বন্ধ করা এবং আগামী ১৮, ১৯, ২০ জানুয়ারি ইজতেমা করার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও সোমবার সারা দেশে জেলা প্রশাসক বরাবর তারা স্মারকলিপি দেবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

সংঘর্ষে নিহত ইসমাইল মন্ডল কোন পক্ষের?
দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ইসমাইল মন্ডল আসলে মাওলানা সাদপন্থি ছিলেন নাকি সাদবিরোধী ছিলেন—সেটা নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। দুই পক্ষই দাবি করেছে, নিহত ইসমাইল মন্ডল তাদের অনুসারী ছিলেন।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সাদবিরোধী ও হেফাজত ইসলামপন্থি কওমি আলেম পক্ষের মুফতি জহির ইবনে মুসলিম মুহাদ্দিস প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদের তথ্য অনুযায়ী আমরা অনুসন্ধান করে পেয়েছি যে উনি দুই/ তিন ধরে মাঠে ছিলেন। সাদপন্থিরা তো গতকাল মাঠে গিয়েছে। তাহলে উনি সাদপন্থি কীভাবে হলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘উনি আমাদেরই। কারণ সাদপন্থি যারা ছিলেন তারা তো কেউ আগে থেকে মাঠে ঢুকে নাই। তিনি আমাদের পক্ষেই ছিলেন বলে ধরে নিতে পারি আমরা।’

অপরদিকে নিহত ইসমাইল মন্ডল সাদপন্থি ছিলেন বলে দাবি করেছেন মাওলানা সাদের বাংলাদেশের গণমাধ্যম শাখার সদস্য মো. মুরসালিন।
তিনি  বলেন, ‘মারা যাওয়া ইসমাইল মন্ডল আমাদের। তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে এসেছেন। তিনি নিজেও তিন চিল্লার সাথী এবং তার ছেলেও তিন চিল্লার সাথী। তারা দুজনে একসাথেই এসেছেন। উনি মাওলানা সাদের অনুসারী।’

এদিকে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পরপরই ইসমাইল মন্ডলের ছেলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তার বাবা নিহত ইসমাইল মন্ডল সাদপন্থি ছিলেন।
তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত একজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

 

কোন পক্ষের হামলায় প্রাণ গেল ইসমাইল মন্ডলের?

মাওনালা সাদপন্থি ও সাদবিরোধী দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় ঠিক কোন পক্ষের হামলায় ইসমাইল মন্ডল প্রাণ হারান সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। দুই পক্ষের সদস্যরাই একে অপরকে দোষারোপ করছেন।
সাদপন্থি এক নেতা বলেন ‘আমরা সকাল থেকে ওখানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিলাম। আমরা যদি সেখানে ভাঙচুর করতেই যেতাম তবে সকালে গিয়েই ভাঙচুর শুরু করে দিতাম। আমরা আমল, তামিল, বিভিন্ন আলোচনা এই সব করছিলাম। এরপর ওরা (সাদবিরোধীরা) বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের ওপরে ঢিল, আধলা, ইট-পাটকেল মারছিল। আমাদের মধ্যে অনেকে আহত হয়েছেন। এক জন ৭০ বছর বয়সীকে দা দিয়ে কোপানো হয়েছে। তিনিই (ইসমাইল মন্ডল) মারা গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সাদপন্থিদের কমপক্ষে দুই লাখ সাথী উপস্থিত ছিল। আর ভেতরে তারা মাত্র ৪/৫ হাজার মাদরাসার ছাত্র উপস্থিত ছিল। আমরা আমাদের “জোড়” প্রোগ্রাম করতে গেছি। আমরা প্রশাসনকে অনেকবার বলেছি যে, আমাদের যদি করতে না দেন তবে দুই পক্ষকেই তুলে দেন। কিন্তু লোকাল প্রশাসনের ছত্রছায়াতে তারা ওখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল। তারা বিভিন্ন দিক থেকে যখন আক্রমণ করা শুরু করে, তখন আমাদের সাথী ভাইয়েরা তা প্রতিহত করেছে। আমাদের ওপরে হামলার যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা কীভাবে সম্ভব বলেন। কারণ আমাদের গ্রুপের প্রায় দুই লাখ সাথী ভাই ছিল, তারা যদি ওদের ওপরে হামলা করত; তবে কি তাদের অস্থিত্ব থাকত।’

তবে অধিকাংশ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে, সাদপন্থিদের আক্রমণে ইসমাইল নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন শনিবার জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষের সময় গুরুতর আঘাত পেয়ে মারা যান ইসমাইল মন্ডল। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। তবে তিনি কোন পক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন সেটা তাৎক্ষণিক জানাতে পারেনি ওসি।

ইসমাইল মন্ডল নিহতের বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে রবিবার  ওসির মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

আজ মাওলানা সাদপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে। মাওলানা সাদের গণমাধ্যম শাখা থেকে জানানো হয়েছে, ৩ ডিসেম্বর, সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলানায়নে তারা সংবাদ সম্মেলন করবেন।

পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী গত শুক্রবার ইজতেমা ময়দানে অবস্থান নিতে যান মাওলানা সাদের অনুসারীরা। তাদের জমায়েত ঠেকাতে দেওবন্দপন্থি মাওলানা জুবায়েরের সমর্থকরা ইজতেমা ময়দানের ফটকে অবস্থান নেয়। ফলে সাদপন্থিরা কেউ ইজতেমা ময়দানে ঢুকতে পারেনি শুক্রবার।

গত শনিবার ফজর নামাজের পর সাদপন্থিরা ইজতেমা ময়দানে ঢোকার চেষ্টা করলে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয় এবং পরে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। তারা ঘটনাস্থলের আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। টঙ্গী আহসানউল্লাহ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ১৩৮ জনকে।

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আশীষ কুমার বণিক জানিয়েছেন, বেশিরভাগ আহতের মাথায় আঘাত রয়েছে। গুরুতর আহত ২৬ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ইজতেমা নিয়ে তাবলিগের দুই পক্ষের বিরোধিতা চরমে রূপ নেয় গত জানুয়ারির ইজতেমার সময়। ওই সময় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা নিয়ে এক পক্ষের বিরোধিতার কারণে ঢাকায় এসেও ফিরে যেতে হয় মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে। সাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কোরআন ও হাদিস নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন।