হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার লক্ষীবাওর জলাবন পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ

0
483

চারিদিকে শুধু জল আর জল। এরই মাঝে হিজল আর করচের বাগান। সেখানে পশু আর পাখির বিচরণ। এমন একটি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জায়গা হল হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার লক্ষীবাওর জলাবন। যা সিলেটের রাতারগুলের চেয়েও আয়তনে বড় এবং বৈচিত্রে ভরপুর। পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ এই জলাবন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পূর্ণতায় লক্ষ্মীবাও’র জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) যেন এক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। বর্ষায় স্বচ্ছ জলের সঙ্গে মিতালি গড়ে বাহারি প্রজাাতর বৃক্ষলতার সবুজ গালিচা। হেমন্তে মনে হয় ছোট ছোট পাহাড়ের মেলবন্ধন। শীতে দেশী-বিদেশী পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় নির্জন এই জলাবন। দূর থেকে জঙ্গলটিকে দেখে মনে হবে যেন পানির উপর ভাসছে। হিজল, বরুণ, কাকুরা,খাগড়া ইত্যাদি গাছ ও গুল্মে পরিপূর্ণ এই জলাবন সকল ঋতুতে বৈচিত্র্যময় পর্যটকদের জন্য। কিন্তু সৌন্দর্যের এই হাতছানিকে সবসময় সাদরে গ্রহণ করতে পারেন না। কারণ এর প্রচার-পরিচিতি কম এবং যোগাযোগে সমস্যা।
পরিবেশবিদদের মতে, পৃথিবীতে ২২টি জলাবন রয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন হচ্ছে সিলেটের রাতারগুল। রাতারগুলের মতোই বানিয়াচঙ্গের লক্ষ্মীবাওর জলাবন। তবে লক্ষ্মীবাওর জলাবনের আকার ও আয়তনের ব্যাপ্তি অনেক বড়। এ জলাবন নিয়ে গবেষণা করলে এনে দিতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় জলাবনের স্বীকৃতি।
বানিয়াচঙ্গ উত্তরের নিভৃত হাওরের অথৈ জলরাশির মধ্যে অপূর্ব রূপ নিয়ে ভেসে আছে লক্ষ্মীবাওর জলাবন। এর দক্ষিণ দিকে লোহাচুড়া, উত্তরে খড়তি আর পশ্চিমে নলাই নদী। তার পূর্ব পাশে আবার রয়েছে গঙ্গাজলের হাওর। জলাবনের আয়তন সাড়ে ৩ কিলোমিটার। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় সমান। কয়েকশ’ বছর আগে প্রকৃতিগতভাবেই এর সৃষ্টি বলে স্থানীয় লোকজন জানান। স্থানীয়দের কাছে লক্ষ্মীবাওর এবং খড়তির জঙ্গল নামে পরিচিত।
হবিগঞ্জ শহর থেকে ১২ মাইল পর বানিয়াচঙ্গ আদর্শবাজার থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের পথ লক্ষ্মীবাওর জলাবনের। জলের মধ্যে বনের অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে বর্ষায় নৌকা, হেমন্তে মোটরসাইকেল, ট্রলি কিংবা পায়ে হেঁটে যেতে হয়। হেমন্তে ভোগান্তি একটু বেশী। বর্ষায় স্বচ্ছ জলেই বনটি বেশী উপভোগ্য।
সরজমিনে দেখা গেছে, এলোমেলো আবার কোথাও সারি সারি হিজল, করচ, বরুণ গাছ। ঢোলকমলি ও নলখাগড়াসহ নানা প্রজাতের জলজ উদ্ভিদে ভরপুর এই বন। হিজল-করচ গাছের সংখ্যা হবে কয়েক হাজার। গাছের ঢালে বসে আছে মাছরাঙা, পানকৌঁড়ি, বালিহাঁস, ডাহুকসহ দেশীয় জাতের নানা রকম পাখি। শরতের বিকেলে অসংখ্য সাদা বক উড়োউড়ি করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, এ বনে মেছোবাঘ, শিয়াল, লাড্ডুকা, কেউটে, গুইসাপ, গুখড়া, দারাইশসহ বিষধর সাপ রয়েছে।
বানিয়াচংয়ের সংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ বিশ্বাস জানন, বনের বার্ষিক আয় সৈদরটুলা সাত মহল্লার ধর্মীয়-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও অতি দরিদ্রদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। পাখির অভয়াশ্রম রক্ষায় সেখানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাখি শিকার করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই বনের পানি এত স্বচ্ছ যে সেই পানিতে বনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। শীতে সেখানের জল কচুরীপানার চাদরে আবৃত থাকে। সেই সময় যখন কচুরীপানার ফুল ফুটে তখন সেখানে মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন,বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট হচ্ছে সিলেটের রাতারগুল। রাতারগুলের চেয়ে লক্ষ্মীবাওর সোয়াম্প ফরেস্টের আকার ও আয়তনের ব্যাপ্তি অনেক বড়। বয়সের দিক থেকেও এটি প্রাচীন।এটা দেশবাসীর কাছে পরিচিতি করে তুলতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি লক্ষ্মীবাওর জলাবন নিয়ে গবেষণা করলে এনে দিতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় জলাবনের স্বীকৃতি।
হবিগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক সফিউল আলম জানান, হাওর, পাহাড় আর সমতলের অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত হবিগঞ্জ জেলা পর্যটকদর আকর্ষণীয় স্থান লক্ষ্মীবাওর জলাবন । জেলা প্রশাসন হবিগঞ্জের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বানিয়াচংয়ের লক্ষীবাওর যাতে আরও পর্যটক বান্ধব করা যায় সেই উদ্যোগ নেয়া হবে।