ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার

0
377

মুুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাবিবঃ জাহেলী যুগের সমাজে পুরুষ ও জীবজন্তুর মধ্যস্থলে ছিল নারীর অবস্থান। কন্যা সন্তানের জন্ম সেখানে ছিল অভিশাপ আর অপমানের বিষয়। যেন তা মহাপাপ বা স্থায়ী অমর্যাদার কারণ। অপমানবোধ আর মর্যাদা রক্ষায় জীবন্ত কবর দেয়া হতো কন্যা সন্তানকে। কত হীন মানসিকতা ও কতটা অপমানবোধ হলে মানুষ নিজের ঔরসজাত সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলতে পারে! সেখানে তো নারীকে মানুষ বলেই গণ্য করা হতো না। না নিজের সত্তার ওপর ছিল তার কোনো অধিকার, না সম্পদের উপর; বরং সে নিজেই ছিল সম্পদ; ওয়ারিসসূত্রে যার হাত বদল হত। ইসলাম এল, নারী মুক্তি পেল। ঘোষণা হল, কত নিষ্ঠুর তোমাদের এ কাজ।

ইসলাম নারীকে যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে, আর কোনো ধর্ম-দর্শন তা দিতে পারেনি। পৃথিবীর সকল জাতি-ধর্ম, বিদ্যা-দর্শন নারীকে ছোট করেছে, নারীর মানহানি ঘটিয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামই একমাত্র জীবনাদর্শ, যা নারীকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীন করেছে ।

একজন নারী, জীবনে তিনটি স্তর অতিক্রম করে। প্রথম স্তর হলো, শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত। দ্বিতীয় স্তর হলো, যৌবনকাল। আর তৃতীয় স্তর হলো, বার্ধক্য। আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এই তিনটি স্তরের প্রতিটিতেই নারী পুরুষের আদর-যত্নে থাকে পরিপুষ্ট ও সমৃদ্ধ।

প্রথমত তার বাল্যকাল কাটে মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসা ও ভরাট যত্নে। মা-বাবার এই মমতাময় ছায়ার নীচে তার জীবন কাটে স্বর্গীয় নিরাপত্তায়। অতঃপর যৌবনে পদার্পণ করার পর ‘স্বামী’ নামক এক কর্তব্যনিষ্ঠ পুরুষ এসে কাঁধে তুলে নেয় তার সকল চাওয়া পাওয়ার দায়িত্ব। অতঃপর বার্ধক্যের দুয়ারে কদম ফেলতেই শত শ্রদ্ধা, মমতা ও হৃদ্যতার ডালি নিয়ে পদতলে উপস্থিত হয় আদরের ছেলে-মেয়েরা। ইসলাম নারীকে এভাবেই দেখেছে আদ্যোপান্ত।

ইসলামে নারীর মর্যাদার এও একটি দিক যে নারী যখন জীবনের প্রথম স্তরে অবস্থান করে এবং কন্যাসন্তান হিসেবে পিতার কাছে থাকে তখন তাদের যত্ন ও লালন পালনকে বেহেশতে প্রবেশের মাধ্যম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে : তোমাদের কারও যদি তিনটি কন্যাসন্তান থাকে এবং তাদের ব্যাপারে সে ধৈর্য ধরে, তাদেরকে খাওয়ায়, পান করায় এবং তাদের আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে তবে এ কন্যাসন্তানেরা তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে’ (নাসায়ী)।

অন্য হাদীসে এসেছে, যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের কষ্ট-যাতনায় ধৈর্য ধরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (মুহাম্মাদ ইবনে ইউনুসের বর্ণনায় এ হাদীসে অতিরিক্ত অংশ হিসেবে এসেছে) একব্যক্তি প্রশ্ন করে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! যদি দুজন হয়? উত্তরে তিনি বললেন, ‘দুজন হলেও’। লোকটি আবার প্রশ্ন করে বলল, ‘যদি একজন হয় হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘একজন হলেও। (বাইহাকী: শুআবুল ঈমান, সহীহ)।

এমনিভাবে নারী যখন জীবনের দ্বিতীয় স্তরে উপনীত হয় এবং বধূ হয়ে স্বামীর ঘরে যায় তখন তার সম্পর্কে ইসলাম বলেছে, তোমাদের মধ্যে সে সর্বোত্তম যে (সদাচারের জন্য) তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে উত্তম’ (তিরমিযী, সহীহ)।

অর্থাৎ যে তার স্ত্রীর সাথে প্রাণপূর্ণ, প্রেম ভরা কোমল আচরণে অভ্যস্ত, স্ত্রীর কোনো ভুল-ত্রুটি হলে রেগে আগুন হয়ে যায় না, বরং মমতার শীতল পরশ তাকে ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য করে এবং যে স্ত্রীর প্রতি সদয় আচরণ করে ও স্ত্রীর দীনদারীতে সহায়তা দেয় তাকে উত্তম স্বামী বলে অভিহিত করা হয়েছে।

তারপর নারী যখন জননী হন, তখন তার প্রতি সন্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে অত্যন্ত কঠিন রূপে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মায়ের যত্ন নাও; কেননা জান্নাত তাঁর পায়ের কাছে’ (নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ, সহীহ)।

তাই সন্তান মায়ের আনুগত্যে যতটা সচেষ্ট হবে, ততটাই বেহেশতের নিকটবর্তী হবে। আর যতখানি অবাধ্য হবে, ঠিক ততখানিই বেহেশতের সুবাসিত প্রাঙ্গণ থেকে দূরে সরে পড়বে।

ইসলাম নারীকে এভাবেই করেছে মর্যাদার পাত্র। পক্ষান্তরে আধুনিক সভ্যতার দাবিদার বিশ্ব নারীর নারীত্বের ওপর চালিয়েছে ভয়াবহ আগ্রাসন। ছিনিয়ে নিয়েছে নারীর ইজ্জত-আব্রু-সম্মান। নারীকে করেছে সস্তা পণ্য দ্রব্যে পরিণত। নারীর প্রতি আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসন জাহিলিয়াতের বর্বরতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বহু বহু গুণে। শত শত পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির সামনে নারীকে ছেড়ে দিয়েছে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে, যা দেখে আবু জেহেল আবু লাহাবের মাথাও লজ্জায় নুয়ে পড়বে।

নারীর সৌন্দর্যকে পণ্য করে ব্যবসা করছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজ, সিনেমা-নাটক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। নারীর সৌন্দর্যকে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে উৎপাদিত পণ্যের মোড়কে। নানা ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপনে, টিভি অথবা পত্রিকার পাতায়। নারীর সৌন্দর্যকে বিক্রি করা হচ্ছে রিসেপশনিস্ট ডেস্কে। উড়ো জাহাজে বিমানবালা রূপে, অথবা হোটেল রেস্টুরেন্টে সেবিকা হিসেবে। পণ্য ও নারী বর্তমানে একাকার। তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার ধারক বাহকেরা নারীর প্রতি এভাবেই চালিয়েছে সর্বাত্মক আক্রমণ। ছিনিয়ে নিয়েছে নারীর পবিত্র ও মর্যাদাময় সত্তা। পুরুষের অভিভাবকত্বের শীতল ছায়া থেকে নারীকে বের করে ছেড়ে দিয়েছে খরতাপ রোদে ঘর্মাক্ত হতে। ঘরের সম্মানজনক দায়িত্ব, সন্তান লালন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব, পরিবার গড়ার দায়িত্ব ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করে নারীকে ঠেলে দিয়েছে উন্মুক্ত মাঠে, পুরুষের মতোই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা অর্জনের বিক্ষুব্ধ ময়দানে, যেখানে নারীকে মিশতে হচ্ছে সৎ-অসৎ ও ভন্ড মানুষের সাথে। কখনো বা বিক্রি করতে হচ্ছে তার সম্ভ্রম চাকরি রক্ষার প্রয়োজনে। পুরুষ কর্মীদের হাতে শিকার হতে হচ্ছে নানা প্রকার হয়রানির।

আল্লাহ যা হালাল করেছেন আধুনিক সভ্যতার পতাকাবাহক গণ তা করে দিচ্ছে হারাম। একাধিক বিবাহ আল্লাহ তাআলা হালাল করেছেন যার মাধ্যমে, প্রায় সকল দেশেই পুরুষের তুলনায় অধিক সংখ্যায় থাকা, নারীরা পুরুষের অভিভাকত্ব পেয়ে যাপন করতে পারে সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন। আধুনিক সভ্যতা পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ হারাম করে বর্ধিত সংখ্যার নারীদের ছেড়ে দিচ্ছে ফেতনা-ফ্যাসাদের পঙ্কিল গহ্বরে অথবা অসহনীয় একাকিত্বের নরক সম যন্ত্রনায়। অন্নবস্ত্রের প্রয়োজনে কাজের সন্ধানে পুরুষের আশ্রয়হীন নারী কখনো কখনো বাধ্য হচ্ছে একাকী পাড়ি জমাতে ভিনদেশে। বাধ্য হচ্ছে মাহরাম বিহীন সফর করতে, পরপুরুষদের মাঝে বসবাস করতে, নিজ ইজ্জত-আব্রুকেও সদা হুমকির মুখে রেখে অন্নবস্ত্রের জোগান দিতে। আল্লাহর শত্রুরা, মানবতার শত্রুরা এভাবেই নারীকে করেছে বিপর্যস্ত। নারীত্বকে করেছে সর্বার্থে ধ্বংস।

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট